পোশাক শ্রমিক আন্দোলনে হাজার কোটি টাকার ক্ষতির শঙ্কা
ঢাকা, , |
আজকের সর্বশেষ সবখবর

পোশাক শ্রমিক আন্দোলনে হাজার কোটি টাকার ক্ষতির শঙ্কায় ব্যবসায়ীরা

জনবার্তা প্রতিবেদন
নভেম্বর ৭, ২০২৬ ১:৩৭ অপরাহ্ণ
Link Copied!

ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের টানা বিক্ষোভ, কর্মবিরতি ও সংঘর্ষে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকশিল্প বড় ধরনের সংকটে পড়েছে। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে চলা আন্দোলনে শত শত কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে কারখানা, যানবাহন ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে।

ব্যবসায়ী ও মালিকপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, চলমান অস্থিরতায় তৈরি পোশাক খাতে সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতি হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। তবে সরাসরি সম্পদহানি ও রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পূর্ণাঙ্গ হিসাব পেতে আরও সময় লাগতে পারে। অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে দেশের রপ্তানি বাজারে নতুন ক্রয়াদেশ হারানোর পাশাপাশি পুরো অর্থনীতিতেও ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) ও দেশের শীর্ষ ব্যবসায়িক সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলনের প্রভাবে পোশাক খাতের পাশাপাশি অন্যান্য শিল্পকারখানাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, গত ১ নভেম্বর মিরপুর, গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলের ৫২৯টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল। এতে প্রায় ৩ কোটি ডলার বা ৩৭৩ কোটি টাকার রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হয়। পরদিন ২ নভেম্বর উৎপাদন বন্ধ থাকা কারখানার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৯০টিতে। ওই দিন আরও প্রায় ৪ কোটি ডলারের সমপরিমাণ রপ্তানি কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বিজিএমইএর হিসাবে, প্রথম দুই দিনেই প্রায় ৭ কোটি ডলার বা ৮৫০ কোটি টাকার রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। এ সময় প্রায় ১৬ লাখ ৮০ হাজার শ্রমিক কাজে যোগ দিতে পারেননি।

পরবর্তী দিনগুলোতেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। বিজিএমইএর তথ্যমতে, ৩ নভেম্বর ১৫০টি, ৪ নভেম্বর ২০০টি এবং ৫ নভেম্বর ৭০টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল। এই তিন দিনে আরও প্রায় ৩৭৩ কোটি টাকার রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। সব মিলিয়ে এসব দিনের হিসাবে রপ্তানি ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ২২৩ কোটি টাকা।

এ ছাড়া শুধু গাজীপুরেই গত ছয় দিনের আন্দোলনে প্রায় ৮৫০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির তথ্য পাওয়া গেছে। তবে বিভিন্ন হিসাবের মধ্যে আংশিক পুনরাবৃত্তি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে আন্দোলনের পুরো সময়ের মোট ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রয়োজন। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, সব ধরনের ক্ষতি বিবেচনায় তা দেড় হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।

বিজিএমইএর হিসাবে, অন্তত ২০ থেকে ২৫টি কারখানায় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। তবে এসব ঘটনায় সরাসরি সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।

অস্থির পরিস্থিতির মধ্যে গাজীপুরের কোনাবাড়ী ও কালিয়াকৈরে কারখানা ও গুদামে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে। মিরপুরে পুলিশের গাড়িতে হামলার পর নিরাপত্তার কারণে মিরপুর-১০, মিরপুর-১১ ও পল্লবী মেট্রোরেল স্টেশনে সাময়িকভাবে ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখা হয়। পরিস্থিতি বিবেচনায় বিভিন্ন এলাকার অনেক কারখানায় মালিকপক্ষ ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়।

স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম জানান, তাঁর ৪৫টি উৎপাদন লাইনবিশিষ্ট দুটি কারখানা বন্ধ রাখায় প্রতিদিন প্রায় ৯০ হাজার ডলার করে ক্ষতি হচ্ছে। কারখানা বন্ধ থাকলেও বিদ্যুৎ, গ্যাস ও রক্ষণাবেক্ষণসহ পরিচালন ব্যয় উদ্যোক্তাদের বহন করতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পোশাক খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময়ে বছরের বড় অংশের ক্রয়াদেশ আসে। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় নির্ধারিত সময়ে বিদেশি ক্রেতাদের পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এতে জরিমানা, আকাশপথে অতিরিক্ত ব্যয়ে পণ্য পাঠানো এবং দীর্ঘমেয়াদে ক্রয়াদেশ অন্য দেশে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

বিজিএমইএর সহসভাপতি (অর্থ) মো. মিজানুর রহমান বলেন, শ্রমিকরা কারখানায় এসে কাজে যোগ না দিয়ে আন্দোলনে অংশ নেওয়ায় উৎপাদন চালানো সম্ভব হয়নি।

এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, পোশাক খাতে এমন বিশৃঙ্খলা দেশের ভাবমূর্তির জন্য নেতিবাচক এবং এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। নির্ধারিত সময়ে পণ্য জাহাজীকরণ করতে না পারলে বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে চুক্তি রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।