বরিশালের কীর্তনখোলা নদীর তীরে অবস্থিত কবি জীবনানন্দ দাশ স্টেডিয়াম দীর্ঘ সংস্কারকাজ শেষে নতুন রূপ পেয়েছে। প্রায় ৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিকায়ন করা এই স্টেডিয়ামে আগামী ১৫ ডিসেম্বর শুরু হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) নতুন ঘরোয়া প্রতিযোগিতা ‘ডোমেস্টিক থ্রি’ বা ডি-থ্রি ট্রফির টি-টোয়েন্টি পর্ব। তবে আধুনিক অবকাঠামোর পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত ক্রিকেট চর্চা ও নতুন খেলোয়াড় তৈরির সুযোগ নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
২০২১ সালে শুরু হওয়া স্টেডিয়ামটির সংস্কারকাজ ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা ছিল। পরে সময় বাড়িয়ে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত করা হলেও নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হয়নি। বর্তমানে প্রায় ৯৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সহকারী প্রকৌশলী মো. রায়হান গাজী। তাঁর প্রত্যাশা, ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে বাকি কাজ শেষ হবে।
সংস্কারের অংশ হিসেবে গ্যালারিতে নতুন চেয়ার বসানো, প্যাভিলিয়ন সংস্কার, মিডিয়া ভবন নির্মাণ, তিনতলা হোস্টেল তৈরি এবং ফ্লাডলাইটের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে নতুন চেয়ার বসানোর পর স্টেডিয়ামের দর্শক ধারণক্ষমতা ৩৫ হাজার থেকে কমে প্রায় ১৯ হাজারে দাঁড়িয়েছে। একই মাঠে ক্রিকেট ও ফুটবল আয়োজনের ব্যবস্থাও থাকছে।
ডি-থ্রি দিয়ে ফিরছে বড় ক্রিকেট আয়োজন
বিসিবির সূচি অনুযায়ী, আগামী ১৫ ডিসেম্বর বরিশালের এই স্টেডিয়ামে একমি ও ফরচুনের ম্যাচ দিয়ে শুরু হবে ডি-থ্রি ট্রফির টি-টোয়েন্টি পর্ব। টুর্নামেন্টের কিছু ম্যাচ ঢাকার মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামেও অনুষ্ঠিত হবে।
ছয়টি করপোরেট প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতায় অংশ নেবে ছয়টি দল—এসি ব্লু স্টার, একমি, সিটিজেনস ব্যাংক, সেভেন রিংস সিমেন্ট, ফরচুন ও ওয়ালটন। দলগুলোর আইকন ক্রিকেটার হিসেবে থাকছেন যথাক্রমে নুরুল হাসান সোহান, মোসাদ্দেক হোসেন, মোহাম্মদ নাঈম শেখ, মুশফিকুর রহিম, তাওহিদ হৃদয় ও মেহেদী হাসান মিরাজ।
তিন সংস্করণের ক্রিকেটকে একটি কাঠামোর আওতায় এনে ঘরোয়া ক্রিকেটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়ানো এবং ক্রিকেটারদের বিভিন্ন সংস্করণে খেলার সুযোগ তৈরি করাই ডি-থ্রি আয়োজনের লক্ষ্য। টি-টোয়েন্টি পর্বের পর আগামী বছরের জানুয়ারিতে চার দিনের এবং মে মাসে এক দিনের প্রতিযোগিতা আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
অবকাঠামোর পাশাপাশি প্রয়োজন স্থানীয় ক্রিকেটের উন্নয়ন
স্টেডিয়াম আধুনিক হলেও বরিশালে নিয়মিত ক্রিকেট চর্চার সুযোগ ও মাঠের সংকট নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। স্থানীয় ক্রিকেটার ও সংগঠকদের মতে, শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন করলেই ভালো খেলোয়াড় তৈরি হবে না। প্রয়োজন নিয়মিত লিগ ও টুর্নামেন্ট, মানসম্মত প্রশিক্ষণ, অনুশীলনের পর্যাপ্ত সুযোগ এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় খেলোয়াড় নির্বাচন।
বিভাগীয় ক্রিকেট দলের সাবেক খেলোয়াড় ও কোচ এজাজ আল মাহমুদের মতে, স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত ক্রিকেট লিগ আয়োজন ছাড়া ক্রিকেটের উন্নয়ন সম্ভব নয়। বরিশাল ফরমার ক্রিকেটার্স ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মীর হাসান মোরশেদও দল পরিচালনা ও খেলোয়াড় নির্বাচনে স্বচ্ছতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
জেলা দলের খেলোয়াড় মাইনুল ইসলাম অভিযোগ করেছেন, গত প্রায় এক দশকে বরিশাল অঞ্চলে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নতুন ক্রিকেটার উঠে আসেনি। অন্যদিকে বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার সদস্যসচিব আনোয়ারুল হক জানিয়েছেন, ক্রীড়াঙ্গনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং খেলোয়াড়দের বিকাশে নতুন কমিটি কাজ করছে। মাঠের সংকট কমাতে স্টেডিয়ামের ভেতরে পরিত্যক্ত সুইমিংপুলের জায়গায় অনুশীলনের মাঠ তৈরির বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।
বিসিবির পরিচালক ও খেলোয়াড় নির্বাচনের সমন্বয়কারী মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, অনুশীলনের সুযোগ বাড়াতে বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (বিকেএসপি) সঙ্গে সমঝোতার পরিকল্পনা চলছে।
১৯৬৬ সালে ২৯ দশমিক ১৫ একর জমিতে প্রতিষ্ঠিত এই স্টেডিয়ামটি ২০০৮ সালে আবদুর রব সেরনিয়াবাতের নামে পরিচিতি পায়। পরে ২০২৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি এর নাম পরিবর্তন করে কবি জীবনানন্দ দাশ স্টেডিয়াম করা হয়।
দীর্ঘ সংস্কারের পর নতুন সাজে প্রস্তুত এই স্টেডিয়ামে বড় ক্রিকেট আয়োজন শুরু হতে যাচ্ছে। এখন স্থানীয় ক্রিকেটারদের নিয়মিত খেলার সুযোগ, প্রশিক্ষণ এবং প্রতিভা বিকাশের ব্যবস্থা কতটা নিশ্চিত করা যায়, তার ওপরই বরিশালের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করছে।



