যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি। মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণই ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেছে। ঐতিহ্যগতভাবে রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত কয়েকটি অঙ্গরাজ্যেও জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের মাঝপথে এ ফলাফল তাঁর প্রশাসনের জন্য বড় রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানোয় মেয়াদের বাকি সময়ে আইন প্রণয়ন, প্রশাসনিক নিয়োগ এবং নীতিনির্ধারণে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে সমঝোতা করতে হবে হোয়াইট হাউসকে।
কংগ্রেসের দুই কক্ষেই ডেমোক্র্যাটদের জয়
মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সব কটিতে এবং সিনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে ৩৫টিতে ভোট অনুষ্ঠিত হয়। পাশাপাশি ৩৬টি অঙ্গরাজ্যে গভর্নর নির্বাচনও হয়।
প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী, প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটরা অন্তত ২৩১টি আসনে জয় পেয়েছেন। রিপাবলিকানদের আসনসংখ্যা অন্তত ১৪১। ভোট গণনা চলায় এ সংখ্যা পরিবর্তিত হতে পারে।
সিনেটে ডেমোক্র্যাটরা ৫৪টি আসন নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করেছেন। রিপাবলিকানদের আসনসংখ্যা ৪৪। দুটি আসনের ফল তখনও চূড়ান্ত হয়নি। এই ফলাফলে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাচ্ছে।
গভর্নর নির্বাচনেও ডেমোক্র্যাটরা এগিয়ে রয়েছেন। প্রাথমিক ফলাফলে ৩৬টি অঙ্গরাজ্যের মধ্যে ২১টিতে ডেমোক্র্যাট এবং ১১টিতে রিপাবলিকান প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন। কয়েকটি রাজ্যে তখনও ফলাফল চূড়ান্ত হয়নি।
রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটিতেও ডেমোক্র্যাটদের জয়
নির্বাচনে দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি ঐতিহ্যগত রিপাবলিকান-সমর্থিত অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্র্যাটদের জয় বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। টেক্সাসে জেমস ট্যালারিকো রিপাবলিকান প্রার্থী কেন প্যাক্সটনকে পরাজিত করেছেন। ক্যানসাসেও ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যাডাম হ্যামিলটন জয় পেয়েছেন। এতে ওই রাজ্যে দীর্ঘদিনের রিপাবলিকান আধিপত্যের অবসান ঘটেছে।
সিনেট নির্বাচনে রিপাবলিকানদের দখলে থাকা সাতটি আসন ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেছে। টেক্সাস, নর্থ ক্যারোলাইনা, সাউথ ক্যারোলাইনা, ওহাইও, ক্যানসাস, আইওয়া ও মেইনে এ পরিবর্তন ঘটেছে।
মিশিগানে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল আল-সাইয়েদ রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে পরাজিত করেছেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম হিসেবে সিনেট সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
এদিকে প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটরা দুই ডজনের বেশি রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত আসন নিজেদের দখলে নিয়েছেন বলে প্রাথমিক ফলাফলে দেখা গেছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ
প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফরিস নির্বাচনী ফলাফলকে পরিবর্তনের পক্ষে জনগণের রায় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, গত দুই বছরে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্তের নেতিবাচক প্রভাব সাধারণ মানুষ নিজেদের জীবনে অনুভব করেছেন।
কংগ্রেসের উভয় কক্ষ ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর নজরদারি ও তদন্তের সুযোগ বাড়বে। পাশাপাশি মন্ত্রিসভার সদস্য এবং ফেডারেল বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রেও ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত সিনেট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।
এর আগে ২০০৬ সালে প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের মেয়াদে মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজিত করে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল ডেমোক্র্যাটরা।
ইরান যুদ্ধ ও অর্থনীতি নিয়ে অসন্তোষ
নির্বাচনী ফলাফলের পেছনে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং ইরান যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে আলোচনা চলছে। ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক সংঘাত ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়িয়েছে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
বিশেষ করে ইরান যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে রিপাবলিকান শিবিরের মধ্যেও আলোচনা তৈরি হয়েছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় ইরান যুদ্ধের প্রভাবকে নির্বাচনে দলের বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন বলে ডন-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
তবে নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পেছনে একক কোনো কারণকে দায়ী করার সুযোগ নেই। অর্থনীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, পররাষ্ট্রনীতি এবং ট্রাম্প প্রশাসনের সামগ্রিক কর্মকাণ্ড—সবকিছুই ভোটারদের সিদ্ধান্তে ভূমিকা রেখে থাকতে পারে।
ফলাফল নিয়ে ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া
নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প বলেন, তিনি কিছুটা বিস্মিত হয়েছেন। একই সঙ্গে ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনী প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন। তবে কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের উত্থানের পর তাদের প্রস্তাবিত আইন নিজের ভেটো ক্ষমতা ব্যবহার করে আটকে দেওয়ার ইঙ্গিতও দিয়েছেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প ‘ভেটো’ লেখা একটি লাল টুপির ছবি প্রকাশ করেন। অন্য এক পোস্টে তিনি বলেন, নির্বাচনে তিনি নিজে প্রার্থী ছিলেন না; সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে তাঁর দল বড় ব্যবধানে জয় পেত।
অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটদের এ জয়কে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের বাকি সময়ের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ফলে প্রশাসনের আইনগত ও নীতিগত উদ্যোগ বাস্তবায়নে বাধা তৈরি হতে পারে।



