ফ্রান্সজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ, বাজেট নিয়ে চাপে ম্যাক্রোঁ সরকার
ঢাকা, , |
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ফ্রান্সজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ: বাজেট নিয়ে চাপে ম্যাক্রোঁ সরকার

জনবার্তা প্রতিবেদন
নভেম্বর ৬, ২০২৬ ৫:০৯ অপরাহ্ণ
Link Copied!

ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, মজুরি স্থবিরতা, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং সরকারি সেবার মানহ্রাসের প্রতিবাদে দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ ও ধর্মঘট পালিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার ১৯৩টি স্থানে আয়োজিত কর্মসূচিতে হাজার হাজার মানুষ রাজপথে নামেন।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন প্রায় ৫ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ। তবে আন্দোলনের ডাক দেওয়া শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১৫ লাখ ৭৩ হাজার। প্যারিসে সরকারি হিসাবে ৬৫ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিলেও শ্রমিক সংগঠন সিজিটির দাবি, রাজধানীতে সমবেত হয়েছিলেন প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার মানুষ।

মার্সেই, বোর্দো, লিল, তুলুজ, লিয়ঁ, নঁত ও রেনসহ দেশটির বিভিন্ন প্রধান শহরেও বড় সমাবেশ ও মিছিল হয়েছে। আন্দোলনকারীরা ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি, বেতন কাঠামো পুনর্নির্ধারণ, কর ব্যবস্থায় পরিবর্তন এবং সরকারি সেবার মান উন্নয়নের দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি শিক্ষাখাতে অর্থায়ন বাড়ানো ও শিক্ষক সংকট নিরসনের দাবিও জোরালো হয়েছে।

বাজেট নিয়ে রাজনৈতিক অচলাবস্থা

চলমান বিক্ষোভ গত সেপ্টেম্বরে শুরু হওয়া আন্দোলনের মধ্যে সবচেয়ে বড়। প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সরকারের ব্যয় সংকোচন নীতি এবং ২০২৭ সালের প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে সংসদে সৃষ্ট অচলাবস্থাকে কেন্দ্র করে জনঅসন্তোষ আরও তীব্র হয়েছে।

বিরোধীদের অভিযোগ, সরকারের কৃচ্ছ্রসাধন পরিকল্পনার সবচেয়ে বেশি চাপ পড়বে সাধারণ মানুষ, নিম্ন আয়ের পরিবার এবং সরকারি সেবার ওপর নির্ভরশীলদের ওপর। অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের দাবি, বাজেট ঘাটতি কমাতে সাধারণ মানুষের সুযোগ-সুবিধা কমানোর পরিবর্তে ধনী ব্যক্তি ও বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের ওপর কর বাড়ানো উচিত।

ফরাসি আইনপ্রণেতারা ২০২৭ সালের বাজেট প্রস্তাবের প্রথম অংশ ইতোমধ্যে প্রত্যাখ্যান করেছেন। আগামী ৯ ডিসেম্বর সিনেটে এ বিষয়ে পুনরায় ভোট হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর পার্লামেন্টের উভয় কক্ষের প্রতিনিধিদের মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা করা হবে।

শিক্ষক-শ্রমিকদের ধর্মঘট

ধর্মঘটে শিক্ষক, রেলকর্মী, স্বাস্থ্যসেবা কর্মী, ডাক বিভাগের কর্মচারী ও জ্বালানি খাতের শ্রমিকরা অংশ নিয়েছেন। অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও শিক্ষার্থীরাও বিক্ষোভে যোগ দেন।

জাতীয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৬ শতাংশ শিক্ষক কর্মবিরতিতে ছিলেন। শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোর দাবি, প্রায় এক হাজার মাধ্যমিক বিদ্যালয় অবরুদ্ধ ছিল। তবে সরকারি হিসাবে অবরুদ্ধ বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৮১টি।

আন্দোলনের সূত্রপাত গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে। অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, শ্রেণিকক্ষের সংকট, শিক্ষকস্বল্পতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিসংক্রান্ত সমস্যার প্রতিবাদে তখন শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করেন।

আন্দোলনে অংশ নেওয়া এক শিক্ষার্থী বলেন, পরিবেশগত সংকট, যুদ্ধ, কর্মসংস্থানের অভাব এবং শিক্ষার ক্রমবর্ধমান ব্যয় তরুণদের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলছে। লিল শহরের আরেক শিক্ষার্থীর অভিযোগ, বেতন বাড়ছে না, অথচ জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমেই বাড়ছে।

পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, গ্রেপ্তার ৪৪৮

বিক্ষোভের অধিকাংশ স্থান শান্তিপূর্ণ থাকলেও প্যারিস ও লিয়ঁসহ কয়েকটি শহরে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে।

সরকারি হিসাবে, বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে অন্তত ৪৪৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং ৫৩ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দেশজুড়ে প্রায় ৭০ হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়।

তুলুজের কাছাকাছি একটি স্কুলে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। প্যারিসের আশপাশের কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লিয়ঁতে মুখোশধারী একদল বিক্ষোভকারীর সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

গত ১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভেও সহিংসতা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছিল।

পরিবহন ও পর্যটনে প্রভাব

ধর্মঘটের প্রভাব পড়েছে পরিবহন ও শিক্ষা খাতে। তবে সামগ্রিকভাবে গণপরিবহন চলাচল তুলনামূলক স্বাভাবিক ছিল।

বিক্ষোভের কারণে আইফেল টাওয়ার ও আর্ক দ্য ত্রিয়ম্ফের মতো জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে।

জ্বালানির দামেও ক্ষোভ

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিও সাধারণ মানুষের অসন্তোষের অন্যতম কারণ। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতার প্রভাবে জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হওয়ায় বাজারে এর প্রভাব পড়েছে।

সংকট মোকাবিলায় গত ১ নভেম্বর সরকার কৌশলগত মজুত থেকে ১ কোটি ব্যারেল ডিজেল বাজারে ছাড়ার ঘোষণা দেয়। অর্থনীতিমন্ত্রী রোলাঁ লেসকিউ জানান, এতে বিভিন্ন পেট্রলপাম্পে লিটারপ্রতি ডিজেলের দাম ১৫ থেকে ২০ সেন্ট পর্যন্ত কমেছে।

তবে আন্দোলনকারীদের মতে, এই সামান্য মূল্যহ্রাস জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের তুলনায় যথেষ্ট নয়। তিন হাজারের বেশি পেট্রলপাম্পে ডিজেলের দাম কমেছে বলে জানা গেছে।

আলোচনার উদ্যোগ সরকারের

পরিস্থিতি শান্ত করতে প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু আগামী সোমবার শ্রমিক ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গে একটি সামাজিক সম্মেলনের আয়োজন করেছেন। সেখানে মজুরি বৃদ্ধি ও জনগণের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আগামী এপ্রিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে চলমান আন্দোলন ম্যাক্রোঁ সরকারের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। জনমত জরিপে ডানপন্থী ন্যাশনাল র‍্যালির মারিন লো পেন এবং বামপন্থী জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁর মতো নেতারা আলোচনায় রয়েছেন।

ম্যাক্রোঁ তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। ফলে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে চলমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট সামাল দেওয়া তাঁর সরকারের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।