খুলনায় চুইঝালের শতকোটি টাকার বাণিজ্য, বাড়ছে উৎপাদন
ঢাকা, , |
আজকের সর্বশেষ সবখবর

খুলনায় চুইঝালের শতকোটি টাকার বাণিজ্য, বাড়ছে উৎপাদন ও চাহিদা

জনবার্তা প্রতিবেদন
নভেম্বর ৫, ২০২৬ ৫:২১ অপরাহ্ণ
Link Copied!

জনবার্তা ডেস্ক

খুলনার ঐতিহ্যবাহী মসলা চুইঝালকে ঘিরে বাড়ছে উৎপাদন, বাজার ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা। একসময় মূলত বসতবাড়ির আঙিনায় সীমিত পরিসরে চাষ হলেও এখন আম, কাঁঠাল ও মেহগনিগাছকে আশ্রয় করে বাণিজ্যিকভাবে চুইঝালের চাষ করছেন কৃষকেরা। স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও বাড়ছে এই মসলার চাহিদা।

খুলনার বড় বাজারের মসলাপট্টিতে গেলে মরিচ-হলুদের পাশাপাশি পাওয়া যায় চুইঝাল। এর ঝাঁজালো স্বাদ ও স্বতন্ত্র ঘ্রাণ খুলনার খাবারের পরিচিত বৈশিষ্ট্য। চুইঝাল মরিচজাতীয় উদ্ভিদ নয়; এটি পানের নিকটাত্মীয়। বৃহত্তর খুলনা ও যশোর অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে রান্নায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে এই মসলা।

বাজারে বাড়ছে বিক্রি, দামও চড়া

খুলনার বড় বাজারে শুধু চুইঝাল বিক্রি করেন—এমন দোকান রয়েছে অন্তত ১৫টি। এ ছাড়া বিভিন্ন মসলার দোকানেও পাওয়া যায় এটি। স্থানীয় বাজারের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন এক হাজার কেজির বেশি চুইঝাল বিক্রি হয়, যার আনুমানিক বাজারমূল্য ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা।

চুই বিক্রেতা অমল বিশ্বাস জানান, তিন বছর আগে কৃষকের কাছ থেকে প্রতি কেজি চুইঝাল ৮০০ টাকায় কেনা গেলেও এখন তা ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। মানভেদে চুইয়ের শিকড় বা মূলের দাম প্রতি কেজি ১ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত ওঠে।

প্রবীণ ক্রেতা অবনীন্দ্রনাথ কুমারের স্মৃতিতে, আশির দশকে প্রতি কেজি চুইঝালের দাম ছিল মাত্র ২ টাকা। সময়ের ব্যবধানে এই মসলার দাম ও বাণিজ্যিক গুরুত্ব—দুটিই বেড়েছে।

উৎপাদন ও চাষে বাড়ছে আগ্রহ

খুলনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চুইঝালের উৎপাদন ৬০০ টন ছাড়িয়েছে। গত ছয় বছরে উৎপাদন বেড়েছে প্রায় আড়াই গুণ।

কেজিপ্রতি ১ হাজার ২০০ টাকা গড় দাম ধরে ৬০০ টন উৎপাদনের আনুমানিক মূল্য দাঁড়ায় ৭২ কোটি টাকা। তবে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, অনানুষ্ঠানিক কেনাবেচাসহ পুরো বাজারের আকার আরও বড় হতে পারে এবং তা শতকোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।

চাহিদা বাড়ায় এখন বিভিন্ন ফলদ ও বনজ গাছকে আশ্রয় করে সাথি ফসল হিসেবে চুইঝালের চাষ জনপ্রিয় হচ্ছে। স্থানীয় নার্সারিগুলোতে চুইয়ের চারা বিক্রিও বেড়েছে। কয়েক বছর আগে যেখানে বছরে ২ থেকে ৩ হাজার চারা বিক্রি হতো, এখন তা বেড়ে ৫০ থেকে ৬০ হাজারে পৌঁছেছে বলে সংশ্লিষ্টদের তথ্য।

বৃহত্তর খুলনার বাইরেও কুড়িগ্রাম, ফরিদপুর ও ঝিনাইদহে চুইঝালের চাষ হচ্ছে।

হোটেলের খাবারেও চুইঝালের জনপ্রিয়তা

খুলনার খাবার হোটেলগুলোতে চুইঝাল দিয়ে রান্না করা মাংসের চাহিদা রয়েছে। বিশেষ করে খুলনা রেলস্টেশনের কাছের হোটেল জাবেদে চুই-মাংসের জন্য দুপুরে ক্রেতাদের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। হোটেলটিতে প্রতিদিন দেড় থেকে দুই মণ চুই-মাংস বিক্রি হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

রান্নায় ব্যবহার ছাড়াও চুইঝালের বিভিন্ন সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগুণ নিয়ে গবেষণা হয়েছে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২০ ও ২০২২ সালের গবেষণায় চুইয়ের নির্যাসে জীবাণুনাশক, ব্যথানাশক ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট কার্যকারিতার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ রয়েছে। তবে এসব গবেষণার ফলকে মানুষের রোগ নিরাময়ের নিশ্চিত প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।

জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতির সম্ভাবনা

চুইঝালের অর্থনৈতিক ও ঐতিহ্যগত গুরুত্ব বিবেচনায় ২০২৪ সালে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সম্ভাব্য ১৫১টি ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের তালিকায় খুলনার চুইঝালকে অন্তর্ভুক্ত করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

উৎপাদন বৃদ্ধি, চারা বিক্রির প্রসার এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চাষের বিস্তার—সব মিলিয়ে চুইঝাল এখন খুলনার কৃষি ও খাদ্যসংস্কৃতির পাশাপাশি অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা তৈরি করছে। পরিকল্পিত চাষাবাদ, মান নিয়ন্ত্রণ ও বাজার সম্প্রসারণ করা গেলে এই ঐতিহ্যবাহী মসলা কৃষকদের আয়ের নতুন উৎস হয়ে উঠতে পারে।