শুধু সরকার পরিবর্তন কিংবা গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মানুষের মৌলিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন অর্থনৈতিক কাঠামোর অগ্রাধিকারমূলক পরিবর্তন এবং তৃণমূল পর্যায় থেকে গড়ে ওঠা অংশগ্রহণমূলক সাংগঠনিক ব্যবস্থা। এমন মত দিয়েছেন লেখক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
গত শনিবার সন্ধ্যায় বাংলা একাডেমির কবি শামসুর রহমান সেমিনার কক্ষে ‘যৌথ পাঠ ধ্রুপদি সাহিত্যের পাঠচক্র’ আয়োজিত ‘বৈশ্বিক গণ-আন্দোলনের অভিমুখীনতা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক জলি তালুকদার।
আলোচনায় অংশ নেন লেখক ও গবেষক আলতাফ পারভেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোশাহিদা সুলতানা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সৈয়দ নিজার এবং পশ্চিমবঙ্গের সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অর্ক ভাদুড়ী।
আলোচনায় আলতাফ পারভেজ বলেন, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে চলমান আন্দোলন কেবল তরুণদের বিদ্রোহ নয়; এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অসন্তোষ। সামরিক খাত ও করপোরেট স্বার্থকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে স্বাস্থ্য, আবাসন ও গণপরিবহনের মতো জনকল্যাণমূলক খাতে বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, সরকার পরিবর্তন হলেও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মূল কাঠামো অপরিবর্তিত থাকলে শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষের জীবনে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসে না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও গণ-অভ্যুত্থানের পর নতুন সরকার ও সংসদ প্রতিষ্ঠিত হলেও শ্রমজীবী মানুষের আবাসন ও শিক্ষার মতো মৌলিক সংকটগুলো যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না।
বিদ্যমান ওপর থেকে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতার সমালোচনা করে তিনি বলেন, স্থানীয় পর্যায়ের মানুষের দাবি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কর্মসূচিতে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে না। পাশাপাশি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ডানপন্থী রাজনীতির উত্থান ও নাগরিক স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার বিরুদ্ধেও মানুষ আন্দোলন করছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোশাহিদা সুলতানা বলেন, নব্য উদারনৈতিক অর্থনৈতিক নীতি এবং যুদ্ধের ব্যয় বৃদ্ধির কারণে জনকল্যাণমূলক খাত সংকুচিত হচ্ছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বিশ্বের শিক্ষার্থী ও শ্রমজীবী মানুষের ওপর।
বাংলাদেশের পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, শ্রমজীবী মানুষ আয়ের তুলনায় আবাসনের পেছনে অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছেন। অথচ এ সংকট নিরসনে কার্যকর আন্দোলন গড়ে উঠছে না। সাধারণ মানুষের বাস্তব প্রয়োজনের আরও কাছাকাছি যাওয়ার জন্য বামপন্থী সংগঠনগুলোর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
পশ্চিমবঙ্গের সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অর্ক ভাদুড়ী বলেন, বাংলাদেশ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার সাম্প্রতিক গণ-অভ্যুত্থান দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে পরিবর্তনের নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
তিনি বলেন, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, গণ-অভ্যুত্থানের পর মানুষের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে পুরোনো ব্যবস্থা নতুন রূপে ফিরে আসতে পারে। তাই রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা পুনর্গঠনের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার পাশাপাশি বহুত্ববাদী সমাজে সব মতের মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।
ফ্রান্সের আন্দোলনের উদাহরণ টেনে অর্ক ভাদুড়ী বলেন, সেখানে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ, শ্রমিক সংগঠনগুলোর সংহতি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা বিশ্বজুড়ে আন্দোলনকারীদের মধ্যে নতুন সংযোগ তৈরি করছে। মানুষ কেবল অর্থনৈতিক দাবিতে নয়, সমাজ ও রাষ্ট্রে নিজেদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্যও রাজপথে নামে।
আলোচনা শেষে বক্তারা বলেন, রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সময়ের সঙ্গে নিজেদের অবস্থান ও কৌশল পর্যালোচনা করতে হবে। গণ-আন্দোলনগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখে সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সংকটের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। অভ্যুত্থানের তাৎক্ষণিক ফল মানুষের প্রত্যাশা পূরণ না করলেও তা ভবিষ্যতের আন্দোলনের ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।



