ইসরাইলের পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে চাপে যুক্তরাষ্ট্র
ঢাকা, , |
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ইসরাইলের পারমাণবিক অস্পষ্টতা নিয়ে নতুন চাপে যুক্তরাষ্ট্র

জনবার্তা প্রতিবেদন
নভেম্বর ৭, ২০২৬ ৭:২০ অপরাহ্ণ
Link Copied!

ইসরাইলের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের দীর্ঘদিনের গোপনীয় নীতি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। প্রায় ছয় দশক ধরে দুই দেশ এমন একটি অবস্থান বজায় রেখেছে, যেখানে ইসরাইলের পারমাণবিক অস্ত্র থাকার বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত হলেও দেশটি কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তা স্বীকার বা অস্বীকার করেনি। এই নীতি ‘পারমাণবিক অস্পষ্টতা’ হিসেবে পরিচিত।

১৯৬০ সালের দিকে নেগেভ মরুভূমিতে দিমোনা পারমাণবিক স্থাপনা নির্মাণের বিষয়টি মার্কিন কর্মকর্তাদের নজরে আসে। সে সময় ইসরাইলের অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা অ্যাডি কোহেন স্থাপনাটিকে টেক্সটাইল কারখানা বলে পরিচয় দিয়েছিলেন। পরে মার্কিন গোয়েন্দা ও কূটনৈতিক নথিতে সেখানে পারমাণবিক স্থাপনা নির্মাণের বিষয়টি উঠে আসে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সিকিউরিটি আর্কাইভের প্রকাশিত নথিতে এ ঘটনার বিবরণ রয়েছে।

ইসরাইলের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের আরেকটি বিষয় ছিল পেনসিলভানিয়ার অ্যাপোলো শহরের নিউক্লিয়ার ম্যাটেরিয়ালস অ্যান্ড ইকুইপমেন্ট করপোরেশন (NUMEC) কারখানা থেকে অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহারযোগ্য ইউরেনিয়ামের হিসাব না মেলা। মার্কিন তদন্তে বিপুল পরিমাণ উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের হিসাবের ঘাটতি পাওয়া যায়। উপাদানটি ইসরাইলে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হলেও তদন্তে এ ধরনের পাচারের চূড়ান্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

ইসরাইলের পারমাণবিক নীতির ভিত্তি হিসেবে কাজ করে ‘কৌশলগত অস্পষ্টতা’। দেশটি পারমাণবিক অস্ত্রের মালিকানা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেনি এবং পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষার কথাও স্বীকার করেনি। ১৯৬৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মেইরের মধ্যে এক গোপন সমঝোতার মাধ্যমে এই অবস্থান আরও সুসংহত হয় বলে গবেষকদের ধারণা। সমঝোতার মূল বিষয় ছিল, ইসরাইল পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা, ঘোষণা বা প্রকাশ্যে প্রদর্শন করবে না; অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও দেশটিকে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তিতে (এনপিটি) যোগ দিতে চাপ দেবে না।

তবে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনা এই দীর্ঘদিনের অবস্থানকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ইসরাইলের সঙ্গে সংঘাত এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি ও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সম্ভাব্য সময়সীমা নিয়ে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ ও সংস্থার মূল্যায়ন থাকলেও এসব হিসাব পরিস্থিতি ও অনুমানের ওপর নির্ভরশীল।

এদিকে গত ৩ নভেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, ইসরাইলের আর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তার প্রয়োজন নেই বলে মনে করায় ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ দেশটিকে দেওয়া বছরে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা বন্ধ করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যমান সামরিক সহায়তা চুক্তির মেয়াদ ২০২৮ সাল পর্যন্ত। ফলে নির্ধারিত সময়ের আগেই সহায়তা বন্ধ করতে হলে এ বিষয়ে নতুন সিদ্ধান্ত ও প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হতে পারে।

মার্কিন আইনপ্রণেতাদের একাংশও ইসরাইলের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে আরও স্পষ্ট অবস্থানের দাবি তুলেছেন। প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য জোয়াকিন কাস্ত্রো সিএনএনকে বলেছেন, ইসরাইলের পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সীমারেখা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না থাকলে দেশটির সঙ্গে সামরিক সহযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্র ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। অন্যদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কংগ্রেসের শুনানিতে ইসরাইলের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা না করার বিষয়টি মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উল্লেখ করেছেন।

ইসরাইলের পারমাণবিক কর্মসূচির গোপনীয়তা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নতুন তথ্যও সামনে এসেছে। ১৯৬৫ সালের জানুয়ারিতে ইসরাইল সফরের পর হেনরি কিসিঞ্জার মার্কিন কূটনীতিকদের কাছে দেশটির পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কর্মসূচি নিয়ে নিজের দৃঢ় সন্দেহের কথা জানান। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সিকিউরিটি আর্কাইভে প্রকাশিত নথিতে এ তথ্য পাওয়া যায়।

১৯৮৬ সালে দিমোনা স্থাপনার সাবেক টেকনিশিয়ান মোরদেচাই ভানুনু ইসরাইলের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পর্কে গোপন তথ্য ও ছবি ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য সানডে টাইমস-এর কাছে প্রকাশ করেন। পরে মোসাদ তাকে রোম থেকে অপহরণ করে ইসরাইলে নিয়ে যায়। সেখানে বিচারের পর তাকে ১৮ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

বর্তমানে ইসরাইলের পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা নেই। তবে স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিপরি) এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, দেশটির কাছে আনুমানিক ৯০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড থাকতে পারে। এসব সংখ্যা স্বাধীন গবেষণা ও অনুমাননির্ভর; ইসরাইলের সরকারি তথ্য নয়।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ইসরাইল যদি আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশও পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জনের প্রতিযোগিতায় উৎসাহিত হতে পারে। এতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার পাশাপাশি পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নীতিও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।