মেরি কুরির সমাধিতে সিসার কফিন কেন ব্যবহার করা হয়েছিল?
ঢাকা, , |
আজকের সর্বশেষ সবখবর

দুই নোবেলজয়ী মেরি কুরির সমাধিতে সিসার কফিন কেন ব্যবহার করা হয়েছিল?

জনবার্তা প্রতিবেদন
নভেম্বর ৭, ২০২৬ ৭:৩৭ অপরাহ্ণ
Link Copied!

মেরি কুরির সমাধিতে সিসার কফিন কেন ব্যবহার করা হয়েছিল?

বিজ্ঞানের ইতিহাসে মেরি কুরি এক অনন্য নাম। তিনি প্রথম নারী নোবেলজয়ী এবং বিশ্বের একমাত্র ব্যক্তি, যিনি বিজ্ঞানের দুটি ভিন্ন শাখায় নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। ১৯০৩ সালে পদার্থবিজ্ঞান এবং ১৯১১ সালে রসায়নে নোবেল অর্জন করেন তিনি। তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে তাঁর গবেষণা আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। তবে এই গবেষণার সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর জীবনের এক করুণ অধ্যায়। মৃত্যুর পর তাঁর কফিনে সিসার আস্তরণ দেওয়া হয়েছিল কেন—এ প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে তেজস্ক্রিয় পদার্থ নিয়ে তাঁর দীর্ঘ গবেষণার ইতিহাসে।

শৈশব ও উচ্চশিক্ষার সংগ্রাম

১৮৬৭ সালের ৭ নভেম্বর পোল্যান্ডের ওয়ারশতে জন্মগ্রহণ করেন মেরি কুরি। জন্মের সময় তাঁর নাম ছিল মারিয়া স্ক্লোদোভস্কা। তখন পোল্যান্ড রুশ সাম্রাজ্যের অধীন ছিল। তাঁর বাবা-মা দুজনই শিক্ষক ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় মেধার পরিচয় দেন মারিয়া। তবে পারিবারিক আর্থিক সংকট এবং নারীদের উচ্চশিক্ষার সীমিত সুযোগ তাঁর সামনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

১৮৯১ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য প্যারিসে পাড়ি জমান তিনি। ভর্তি হন সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে, যেখানে তাঁর নাম হয় মেরি। ১৮৯৩ সালে পদার্থবিজ্ঞানে এবং ১৮৯৪ সালে গণিতে ডিগ্রি অর্জন করেন। কঠোর অধ্যবসায়ের মাধ্যমে ধীরে ধীরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন বিজ্ঞানের জগতে।

পিয়েরে কুরির সঙ্গে পরিচয় ও নতুন মৌল আবিষ্কার

প্যারিসে গবেষণার সূত্রে ১৮৯৪ সালে ফরাসি বিজ্ঞানী পিয়েরে কুরির সঙ্গে পরিচয় হয় মেরির। পরের বছর, ১৮৯৫ সালে তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এরপর দুজন একসঙ্গে তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে গবেষণা শুরু করেন।

১৮৯৬ সালে বিজ্ঞানী অঁরি বেকেরেল ইউরেনিয়াম থেকে স্বতঃস্ফূর্ত বিকিরণ নির্গমনের ঘটনা আবিষ্কার করেন। এই আবিষ্কার মেরি ও পিয়েরেকে নতুন গবেষণায় উৎসাহিত করে। তাঁদের গবেষণার ধারাবাহিকতায় ১৮৯৮ সালে পোলোনিয়াম ও রেডিয়াম নামের দুটি নতুন মৌল আবিষ্কৃত হয়। মেরির জন্মভূমি পোল্যান্ডের নাম অনুসারে পোলোনিয়ামের নামকরণ করা হয়।

প্রথম ও দ্বিতীয় নোবেল পুরস্কার

১৯০৩ সালে তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ মেরি কুরি, পিয়েরে কুরি ও অঁরি বেকেরেল যৌথভাবে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান। এর মধ্য দিয়ে মেরি কুরি হন ইতিহাসের প্রথম নারী নোবেলজয়ী।

১৯০৬ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় পিয়েরে কুরির মৃত্যু হয়। স্বামীর মৃত্যুর পরও গবেষণা চালিয়ে যান মেরি। তিনি প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ে পিয়েরের অধ্যাপনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রথম নারী অধ্যাপক হন।

১৯১১ সালে রেডিয়াম পৃথকীকরণ এবং তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ রসায়নে দ্বিতীয় নোবেল পুরস্কার পান তিনি। বিজ্ঞানের দুটি ভিন্ন শাখায় নোবেলজয়ী হিসেবে তাঁর এই অর্জন এখনো অনন্য।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে এক্স-রে সেবায় ভূমিকা

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় মেরি কুরি গবেষণাগারের বাইরে মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। আহত সৈন্যদের শরীরের ভেতরে থাকা গুলি ও হাড়ের ভাঙন শনাক্ত করতে এক্স-রে প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নেন তিনি। নিজের উদ্যোগে গাড়িতে এক্স-রে যন্ত্র স্থাপন করে ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসাসেবা চালু করেন। এসব গাড়ি পরে ‘পেতি কুরি’ নামে পরিচিতি পায়।

মেয়ে ইরেনকে সঙ্গে নিয়ে তিনি চিকিৎসাকর্মীদের এক্স-রে যন্ত্র ব্যবহারের প্রশিক্ষণও দেন। যুদ্ধক্ষেত্রে চিকিৎসাসেবায় তাঁর এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তেজস্ক্রিয়তার প্রভাব ও মৃত্যু

মেরি কুরির গবেষণার সময় তেজস্ক্রিয় পদার্থের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের স্পষ্ট ধারণা ছিল না। ফলে তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা অনেক সময় পর্যাপ্ত সুরক্ষাব্যবস্থা ছাড়াই তেজস্ক্রিয় পদার্থ নিয়ে কাজ করতেন। রেডিয়াম ও পোলোনিয়ামের মতো পদার্থের সংস্পর্শে দীর্ঘদিন থাকার পাশাপাশি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় এক্স-রে ব্যবহারের ক্ষেত্রেও তিনি বিকিরণের মুখোমুখি হন।

১৯৩৪ সালের ৪ জুলাই ৬৬ বছর বয়সে ফ্রান্সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান মেরি কুরি। তাঁর মৃত্যুর কারণ ছিল অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়া—এক ধরনের রক্তরোগ, যাতে অস্থিমজ্জা পর্যাপ্ত রক্তকণিকা তৈরি করতে পারে না। দীর্ঘদিনের বিকিরণ-সংস্পর্শকে তাঁর অসুস্থতার গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

সিসার কফিন ব্যবহারের কারণ কী?

মেরি কুরির মৃত্যুর পর ১৯৩৪ সালে তাঁকে ফ্রান্সের সেঁ শহরের একটি সমাধিক্ষেত্রে সমাহিত করা হয়। তাঁর দেহে তেজস্ক্রিয় পদার্থের সম্ভাব্য উপস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে কফিনের ভেতরে সিসার আস্তরণ ব্যবহার করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। সিসা বিকিরণের কিছু ধরন আটকে রাখতে সক্ষম হওয়ায় এটি সম্ভাব্য বিকিরণ থেকে আশপাশের পরিবেশ ও মানুষকে সুরক্ষিত রাখার একটি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা ছিল।

১৯৯৫ সালে ফ্রান্সের জাতীয় স্মৃতিসৌধ প্যানথিওনে মেরি ও পিয়েরে কুরির দেহাবশেষ পুনঃসমাহিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ সময় তাঁদের পুরোনো সমাধি খোলার আগে ফরাসি বিকিরণ সুরক্ষা কর্তৃপক্ষের বিশেষজ্ঞরা সেখানে বিকিরণের মাত্রা পরীক্ষা করেন।

মেরির কাঠের কফিনের ভেতরে প্রায় ২ দশমিক ৫ মিলিমিটার পুরু সিসার আস্তরণযুক্ত আরেকটি কফিন পাওয়া যায়। তবে পরীক্ষায় তাঁর দেহ থেকে বিপজ্জনক মাত্রার বিকিরণ পাওয়া যায়নি। ফলে তাঁর শরীর তখনো অত্যন্ত তেজস্ক্রিয় ছিল—এমন প্রচলিত ধারণার পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ নেই। বরং মৃত্যুর সময়কার সতর্কতামূলক ব্যবস্থার অংশ হিসেবেই সিসার কফিন ব্যবহৃত হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।

১৯৯৫ সালের ২০ এপ্রিল প্যারিসের প্যানথিওনে মেরি ও পিয়েরে কুরিকে পুনঃসমাহিত করা হয়। এর মধ্য দিয়ে মেরি কুরি নিজের বৈজ্ঞানিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ প্যানথিওনে সমাহিত হওয়া প্রথম নারী হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেন।

কুরি পরিবারের বৈজ্ঞানিক উত্তরাধিকার

মেরি কুরির বৈজ্ঞানিক উত্তরাধিকার পরবর্তী প্রজন্মেও অব্যাহত থাকে। তাঁর মেয়ে ইরেন কুরি ও জামাতা ফ্রেদেরিক জোলিও-কুরি ১৯৩৫ সালে কৃত্রিম তেজস্ক্রিয়তা আবিষ্কারের জন্য রসায়নে নোবেল পুরস্কার পান।

মেরি কুরির গবেষণা শুধু দুটি নতুন মৌল আবিষ্কারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তেজস্ক্রিয়তা সম্পর্কে মানুষের ধারণা, চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিকিরণের ব্যবহার এবং আধুনিক পারমাণবিক বিজ্ঞানের বিকাশে তাঁর অবদান আজও স্মরণীয়। বিজ্ঞানচর্চার প্রতি তাঁর নিষ্ঠা ও অধ্যবসায় পরবর্তী প্রজন্মের গবেষকদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে রয়েছে।

বিজ্ঞানের ইতিহাসে মেরি কুরি এক অনন্য নাম। তিনি প্রথম নারী নোবেলজয়ী এবং বিশ্বের একমাত্র ব্যক্তি, যিনি বিজ্ঞানের দুটি ভিন্ন শাখায় নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। ১৯০৩ সালে পদার্থবিজ্ঞান এবং ১৯১১ সালে রসায়নে নোবেল অর্জন করেন তিনি। তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে তাঁর গবেষণা আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। তবে এই গবেষণার সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর জীবনের এক করুণ অধ্যায়। মৃত্যুর পর তাঁর কফিনে সিসার আস্তরণ দেওয়া হয়েছিল কেন—এ প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে তেজস্ক্রিয় পদার্থ নিয়ে তাঁর দীর্ঘ গবেষণার ইতিহাসে।

শৈশব ও উচ্চশিক্ষার সংগ্রাম

১৮৬৭ সালের ৭ নভেম্বর পোল্যান্ডের ওয়ারশতে জন্মগ্রহণ করেন মেরি কুরি। জন্মের সময় তাঁর নাম ছিল মারিয়া স্ক্লোদোভস্কা। তখন পোল্যান্ড রুশ সাম্রাজ্যের অধীন ছিল। তাঁর বাবা-মা দুজনই শিক্ষক ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় মেধার পরিচয় দেন মারিয়া। তবে পারিবারিক আর্থিক সংকট এবং নারীদের উচ্চশিক্ষার সীমিত সুযোগ তাঁর সামনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

১৮৯১ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য প্যারিসে পাড়ি জমান তিনি। ভর্তি হন সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে, যেখানে তাঁর নাম হয় মেরি। ১৮৯৩ সালে পদার্থবিজ্ঞানে এবং ১৮৯৪ সালে গণিতে ডিগ্রি অর্জন করেন। কঠোর অধ্যবসায়ের মাধ্যমে ধীরে ধীরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন বিজ্ঞানের জগতে।

পিয়েরে কুরির সঙ্গে পরিচয় ও নতুন মৌল আবিষ্কার

প্যারিসে গবেষণার সূত্রে ১৮৯৪ সালে ফরাসি বিজ্ঞানী পিয়েরে কুরির সঙ্গে পরিচয় হয় মেরির। পরের বছর, ১৮৯৫ সালে তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এরপর দুজন একসঙ্গে তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে গবেষণা শুরু করেন।

১৮৯৬ সালে বিজ্ঞানী অঁরি বেকেরেল ইউরেনিয়াম থেকে স্বতঃস্ফূর্ত বিকিরণ নির্গমনের ঘটনা আবিষ্কার করেন। এই আবিষ্কার মেরি ও পিয়েরেকে নতুন গবেষণায় উৎসাহিত করে। তাঁদের গবেষণার ধারাবাহিকতায় ১৮৯৮ সালে পোলোনিয়াম ও রেডিয়াম নামের দুটি নতুন মৌল আবিষ্কৃত হয়। মেরির জন্মভূমি পোল্যান্ডের নাম অনুসারে পোলোনিয়ামের নামকরণ করা হয়।

প্রথম ও দ্বিতীয় নোবেল পুরস্কার

১৯০৩ সালে তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ মেরি কুরি, পিয়েরে কুরি ও অঁরি বেকেরেল যৌথভাবে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান। এর মধ্য দিয়ে মেরি কুরি হন ইতিহাসের প্রথম নারী নোবেলজয়ী।

১৯০৬ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় পিয়েরে কুরির মৃত্যু হয়। স্বামীর মৃত্যুর পরও গবেষণা চালিয়ে যান মেরি। তিনি প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ে পিয়েরের অধ্যাপনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রথম নারী অধ্যাপক হন।

১৯১১ সালে রেডিয়াম পৃথকীকরণ এবং তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ রসায়নে দ্বিতীয় নোবেল পুরস্কার পান তিনি। বিজ্ঞানের দুটি ভিন্ন শাখায় নোবেলজয়ী হিসেবে তাঁর এই অর্জন এখনো অনন্য।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে এক্স-রে সেবায় ভূমিকা

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় মেরি কুরি গবেষণাগারের বাইরে মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। আহত সৈন্যদের শরীরের ভেতরে থাকা গুলি ও হাড়ের ভাঙন শনাক্ত করতে এক্স-রে প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নেন তিনি। নিজের উদ্যোগে গাড়িতে এক্স-রে যন্ত্র স্থাপন করে ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসাসেবা চালু করেন। এসব গাড়ি পরে ‘পেতি কুরি’ নামে পরিচিতি পায়।

মেয়ে ইরেনকে সঙ্গে নিয়ে তিনি চিকিৎসাকর্মীদের এক্স-রে যন্ত্র ব্যবহারের প্রশিক্ষণও দেন। যুদ্ধক্ষেত্রে চিকিৎসাসেবায় তাঁর এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তেজস্ক্রিয়তার প্রভাব ও মৃত্যু

মেরি কুরির গবেষণার সময় তেজস্ক্রিয় পদার্থের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের স্পষ্ট ধারণা ছিল না। ফলে তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা অনেক সময় পর্যাপ্ত সুরক্ষাব্যবস্থা ছাড়াই তেজস্ক্রিয় পদার্থ নিয়ে কাজ করতেন। রেডিয়াম ও পোলোনিয়ামের মতো পদার্থের সংস্পর্শে দীর্ঘদিন থাকার পাশাপাশি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় এক্স-রে ব্যবহারের ক্ষেত্রেও তিনি বিকিরণের মুখোমুখি হন।

১৯৩৪ সালের ৪ জুলাই ৬৬ বছর বয়সে ফ্রান্সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান মেরি কুরি। তাঁর মৃত্যুর কারণ ছিল অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়া—এক ধরনের রক্তরোগ, যাতে অস্থিমজ্জা পর্যাপ্ত রক্তকণিকা তৈরি করতে পারে না। দীর্ঘদিনের বিকিরণ-সংস্পর্শকে তাঁর অসুস্থতার গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

সিসার কফিন ব্যবহারের কারণ কী?

মেরি কুরির মৃত্যুর পর ১৯৩৪ সালে তাঁকে ফ্রান্সের সেঁ শহরের একটি সমাধিক্ষেত্রে সমাহিত করা হয়। তাঁর দেহে তেজস্ক্রিয় পদার্থের সম্ভাব্য উপস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে কফিনের ভেতরে সিসার আস্তরণ ব্যবহার করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। সিসা বিকিরণের কিছু ধরন আটকে রাখতে সক্ষম হওয়ায় এটি সম্ভাব্য বিকিরণ থেকে আশপাশের পরিবেশ ও মানুষকে সুরক্ষিত রাখার একটি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা ছিল।

১৯৯৫ সালে ফ্রান্সের জাতীয় স্মৃতিসৌধ প্যানথিওনে মেরি ও পিয়েরে কুরির দেহাবশেষ পুনঃসমাহিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ সময় তাঁদের পুরোনো সমাধি খোলার আগে ফরাসি বিকিরণ সুরক্ষা কর্তৃপক্ষের বিশেষজ্ঞরা সেখানে বিকিরণের মাত্রা পরীক্ষা করেন।

মেরির কাঠের কফিনের ভেতরে প্রায় ২ দশমিক ৫ মিলিমিটার পুরু সিসার আস্তরণযুক্ত আরেকটি কফিন পাওয়া যায়। তবে পরীক্ষায় তাঁর দেহ থেকে বিপজ্জনক মাত্রার বিকিরণ পাওয়া যায়নি। ফলে তাঁর শরীর তখনো অত্যন্ত তেজস্ক্রিয় ছিল—এমন প্রচলিত ধারণার পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ নেই। বরং মৃত্যুর সময়কার সতর্কতামূলক ব্যবস্থার অংশ হিসেবেই সিসার কফিন ব্যবহৃত হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।

১৯৯৫ সালের ২০ এপ্রিল প্যারিসের প্যানথিওনে মেরি ও পিয়েরে কুরিকে পুনঃসমাহিত করা হয়। এর মধ্য দিয়ে মেরি কুরি নিজের বৈজ্ঞানিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ প্যানথিওনে সমাহিত হওয়া প্রথম নারী হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেন।

কুরি পরিবারের বৈজ্ঞানিক উত্তরাধিকার

মেরি কুরির বৈজ্ঞানিক উত্তরাধিকার পরবর্তী প্রজন্মেও অব্যাহত থাকে। তাঁর মেয়ে ইরেন কুরি ও জামাতা ফ্রেদেরিক জোলিও-কুরি ১৯৩৫ সালে কৃত্রিম তেজস্ক্রিয়তা আবিষ্কারের জন্য রসায়নে নোবেল পুরস্কার পান।

মেরি কুরির গবেষণা শুধু দুটি নতুন মৌল আবিষ্কারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তেজস্ক্রিয়তা সম্পর্কে মানুষের ধারণা, চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিকিরণের ব্যবহার এবং আধুনিক পারমাণবিক বিজ্ঞানের বিকাশে তাঁর অবদান আজও স্মরণীয়। বিজ্ঞানচর্চার প্রতি তাঁর নিষ্ঠা ও অধ্যবসায় পরবর্তী প্রজন্মের গবেষকদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে রয়েছে।

বিজ্ঞানের ইতিহাসে মেরি কুরি এক অনন্য নাম। তিনি প্রথম নারী নোবেলজয়ী এবং বিশ্বের একমাত্র ব্যক্তি, যিনি বিজ্ঞানের দুটি ভিন্ন শাখায় নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। ১৯০৩ সালে পদার্থবিজ্ঞান এবং ১৯১১ সালে রসায়নে নোবেল অর্জন করেন তিনি। তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে তাঁর গবেষণা আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। তবে এই গবেষণার সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর জীবনের এক করুণ অধ্যায়। মৃত্যুর পর তাঁর কফিনে সিসার আস্তরণ দেওয়া হয়েছিল কেন—এ প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে তেজস্ক্রিয় পদার্থ নিয়ে তাঁর দীর্ঘ গবেষণার ইতিহাসে।

শৈশব ও উচ্চশিক্ষার সংগ্রাম

১৮৬৭ সালের ৭ নভেম্বর পোল্যান্ডের ওয়ারশতে জন্মগ্রহণ করেন মেরি কুরি। জন্মের সময় তাঁর নাম ছিল মারিয়া স্ক্লোদোভস্কা। তখন পোল্যান্ড রুশ সাম্রাজ্যের অধীন ছিল। তাঁর বাবা-মা দুজনই শিক্ষক ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় মেধার পরিচয় দেন মারিয়া। তবে পারিবারিক আর্থিক সংকট এবং নারীদের উচ্চশিক্ষার সীমিত সুযোগ তাঁর সামনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

১৮৯১ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য প্যারিসে পাড়ি জমান তিনি। ভর্তি হন সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে, যেখানে তাঁর নাম হয় মেরি। ১৮৯৩ সালে পদার্থবিজ্ঞানে এবং ১৮৯৪ সালে গণিতে ডিগ্রি অর্জন করেন। কঠোর অধ্যবসায়ের মাধ্যমে ধীরে ধীরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন বিজ্ঞানের জগতে।

পিয়েরে কুরির সঙ্গে পরিচয় ও নতুন মৌল আবিষ্কার

প্যারিসে গবেষণার সূত্রে ১৮৯৪ সালে ফরাসি বিজ্ঞানী পিয়েরে কুরির সঙ্গে পরিচয় হয় মেরির। পরের বছর, ১৮৯৫ সালে তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এরপর দুজন একসঙ্গে তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে গবেষণা শুরু করেন।

১৮৯৬ সালে বিজ্ঞানী অঁরি বেকেরেল ইউরেনিয়াম থেকে স্বতঃস্ফূর্ত বিকিরণ নির্গমনের ঘটনা আবিষ্কার করেন। এই আবিষ্কার মেরি ও পিয়েরেকে নতুন গবেষণায় উৎসাহিত করে। তাঁদের গবেষণার ধারাবাহিকতায় ১৮৯৮ সালে পোলোনিয়াম ও রেডিয়াম নামের দুটি নতুন মৌল আবিষ্কৃত হয়। মেরির জন্মভূমি পোল্যান্ডের নাম অনুসারে পোলোনিয়ামের নামকরণ করা হয়।

প্রথম ও দ্বিতীয় নোবেল পুরস্কার

১৯০৩ সালে তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ মেরি কুরি, পিয়েরে কুরি ও অঁরি বেকেরেল যৌথভাবে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান। এর মধ্য দিয়ে মেরি কুরি হন ইতিহাসের প্রথম নারী নোবেলজয়ী।

১৯০৬ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় পিয়েরে কুরির মৃত্যু হয়। স্বামীর মৃত্যুর পরও গবেষণা চালিয়ে যান মেরি। তিনি প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ে পিয়েরের অধ্যাপনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রথম নারী অধ্যাপক হন।

১৯১১ সালে রেডিয়াম পৃথকীকরণ এবং তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ রসায়নে দ্বিতীয় নোবেল পুরস্কার পান তিনি। বিজ্ঞানের দুটি ভিন্ন শাখায় নোবেলজয়ী হিসেবে তাঁর এই অর্জন এখনো অনন্য।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে এক্স-রে সেবায় ভূমিকা

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় মেরি কুরি গবেষণাগারের বাইরে মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। আহত সৈন্যদের শরীরের ভেতরে থাকা গুলি ও হাড়ের ভাঙন শনাক্ত করতে এক্স-রে প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নেন তিনি। নিজের উদ্যোগে গাড়িতে এক্স-রে যন্ত্র স্থাপন করে ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসাসেবা চালু করেন। এসব গাড়ি পরে ‘পেতি কুরি’ নামে পরিচিতি পায়।

মেয়ে ইরেনকে সঙ্গে নিয়ে তিনি চিকিৎসাকর্মীদের এক্স-রে যন্ত্র ব্যবহারের প্রশিক্ষণও দেন। যুদ্ধক্ষেত্রে চিকিৎসাসেবায় তাঁর এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তেজস্ক্রিয়তার প্রভাব ও মৃত্যু

মেরি কুরির গবেষণার সময় তেজস্ক্রিয় পদার্থের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের স্পষ্ট ধারণা ছিল না। ফলে তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা অনেক সময় পর্যাপ্ত সুরক্ষাব্যবস্থা ছাড়াই তেজস্ক্রিয় পদার্থ নিয়ে কাজ করতেন। রেডিয়াম ও পোলোনিয়ামের মতো পদার্থের সংস্পর্শে দীর্ঘদিন থাকার পাশাপাশি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় এক্স-রে ব্যবহারের ক্ষেত্রেও তিনি বিকিরণের মুখোমুখি হন।

১৯৩৪ সালের ৪ জুলাই ৬৬ বছর বয়সে ফ্রান্সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান মেরি কুরি। তাঁর মৃত্যুর কারণ ছিল অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়া—এক ধরনের রক্তরোগ, যাতে অস্থিমজ্জা পর্যাপ্ত রক্তকণিকা তৈরি করতে পারে না। দীর্ঘদিনের বিকিরণ-সংস্পর্শকে তাঁর অসুস্থতার গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

সিসার কফিন ব্যবহারের কারণ কী?

মেরি কুরির মৃত্যুর পর ১৯৩৪ সালে তাঁকে ফ্রান্সের সেঁ শহরের একটি সমাধিক্ষেত্রে সমাহিত করা হয়। তাঁর দেহে তেজস্ক্রিয় পদার্থের সম্ভাব্য উপস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে কফিনের ভেতরে সিসার আস্তরণ ব্যবহার করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। সিসা বিকিরণের কিছু ধরন আটকে রাখতে সক্ষম হওয়ায় এটি সম্ভাব্য বিকিরণ থেকে আশপাশের পরিবেশ ও মানুষকে সুরক্ষিত রাখার একটি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা ছিল।

১৯৯৫ সালে ফ্রান্সের জাতীয় স্মৃতিসৌধ প্যানথিওনে মেরি ও পিয়েরে কুরির দেহাবশেষ পুনঃসমাহিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ সময় তাঁদের পুরোনো সমাধি খোলার আগে ফরাসি বিকিরণ সুরক্ষা কর্তৃপক্ষের বিশেষজ্ঞরা সেখানে বিকিরণের মাত্রা পরীক্ষা করেন।

মেরির কাঠের কফিনের ভেতরে প্রায় ২ দশমিক ৫ মিলিমিটার পুরু সিসার আস্তরণযুক্ত আরেকটি কফিন পাওয়া যায়। তবে পরীক্ষায় তাঁর দেহ থেকে বিপজ্জনক মাত্রার বিকিরণ পাওয়া যায়নি। ফলে তাঁর শরীর তখনো অত্যন্ত তেজস্ক্রিয় ছিল—এমন প্রচলিত ধারণার পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ নেই। বরং মৃত্যুর সময়কার সতর্কতামূলক ব্যবস্থার অংশ হিসেবেই সিসার কফিন ব্যবহৃত হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।

১৯৯৫ সালের ২০ এপ্রিল প্যারিসের প্যানথিওনে মেরি ও পিয়েরে কুরিকে পুনঃসমাহিত করা হয়। এর মধ্য দিয়ে মেরি কুরি নিজের বৈজ্ঞানিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ প্যানথিওনে সমাহিত হওয়া প্রথম নারী হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেন।

কুরি পরিবারের বৈজ্ঞানিক উত্তরাধিকার

মেরি কুরির বৈজ্ঞানিক উত্তরাধিকার পরবর্তী প্রজন্মেও অব্যাহত থাকে। তাঁর মেয়ে ইরেন কুরি ও জামাতা ফ্রেদেরিক জোলিও-কুরি ১৯৩৫ সালে কৃত্রিম তেজস্ক্রিয়তা আবিষ্কারের জন্য রসায়নে নোবেল পুরস্কার পান।

মেরি কুরির গবেষণা শুধু দুটি নতুন মৌল আবিষ্কারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তেজস্ক্রিয়তা সম্পর্কে মানুষের ধারণা, চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিকিরণের ব্যবহার এবং আধুনিক পারমাণবিক বিজ্ঞানের বিকাশে তাঁর অবদান আজও স্মরণীয়। বিজ্ঞানচর্চার প্রতি তাঁর নিষ্ঠা ও অধ্যবসায় পরবর্তী প্রজন্মের গবেষকদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে রয়েছে।