জনবার্তা ডেস্ক
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি দামে চাপে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ। বাজারে গিয়ে মাছ-মাংসের দাম শুনে অনেককেই খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে। কারও খাবারের তালিকা থেকে বাদ পড়েছে মাছ-মাংস, আবার কেউ সংসারের খরচ সামলাতে চাল, ডাল, তেল ও আলুর মতো প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতেও হিসাব কষছেন। আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান সামলাতে গিয়ে কমছে খাবারের পরিমাণ ও বৈচিত্র্য, ভাঙছে সঞ্চয়, অপূর্ণ থাকছে সন্তানের আবদার।
রাজধানীর কারওয়ান বাজারসহ বিভিন্ন এলাকার ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র উঠে এসেছে। তাঁদের ভাষ্য, বাজারের খরচের পাশাপাশি যাতায়াত, জ্বালানি ও অন্যান্য ব্যয় মেটাতে গিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেকের আয়ও আগের তুলনায় কমেছে। ফলে ন্যূনতম প্রয়োজন মেটাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী রিফাত জানান, নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় তাঁর ব্যবসায়ও প্রভাব পড়েছে। আগে দৈনিক পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা আয় হলেও এখন তা কমে প্রায় তিন হাজার টাকায় নেমেছে। আয় কমে যাওয়ায় প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনাও সীমিত করতে হয়েছে তাঁকে।
রাস্তার পাশের দোকানি মিজানের পরিস্থিতি আরও কঠিন। তাঁর দৈনিক আয় ছয় থেকে সাতশ টাকা হলেও খরচ দাঁড়ায় সাত থেকে আটশ টাকায়। মিজানের ভাষ্য, নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষ অনেক সময় অভাবের কথা কাউকে বলতে পারেন না। অথচ সন্তানদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করাও তাঁদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এক মধ্যবিত্ত দম্পতির অভিজ্ঞতা, বাজারে গেলে দুই হাজার টাকার কমে প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করা কঠিন। তাঁদের মাসিক আয় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। এর প্রায় অর্ধেকই ব্যয় হচ্ছে বাজারে। পোশাক কারখানার মার্চেন্ডাইজার সাইফও জানান, পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রয়োজনীয় অনেক কিছু কেনা থেকে বিরত থাকতে হচ্ছে তাঁকে।
দাম বাড়ার প্রভাব পড়েছে খুচরা ব্যবসায়ীদের ওপরও। বিক্রেতা আহাদ আলী জানান, গত এক বছরে পাম তেল ও পোলাওয়ের চালের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আগে পাইকারিতে ১২০ থেকে ১২৫ টাকায় কেনা পাম তেল এখন ১৮৫ থেকে ১৮৬ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।
মাছ বিক্রেতা শাকিলের মতে, কয়েক বছর আগেও ১৮০ থেকে ৩০০ টাকার মধ্যে মোটামুটি ভালো বাজার করা যেত। এখন শুধু সবজি কিনতেই প্রায় ৫০০ টাকা খরচ হয়ে যায়।
দিনমজুর আমীন আলীর সংকট আরও গভীর। কাজ না পাওয়ায় তাঁর আয় কমেছে। গরুর মাংস এখন তাঁর কাছে বিলাসিতার মতো। তিনি বলেন, দৈনিক আয়ের টাকায় চাল, ডাল, তেল ও আলু কেনাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
এক মধ্যবয়স্ক বাবা জানান, বাসায় গ্যাস না থাকায় রান্নার জন্য বাড়তি জ্বালানি খরচ করতে হচ্ছে। সন্তানের দুধ কেনার সামর্থ্য না থাকায় বিকল্প খাবার দিতে হচ্ছে তাঁকে। মিলন নামে এক সেলাই কর্মীও জানান, পরিবারের খরচ চালাতে স্ত্রীকে কাজে পাঠাতে হয়েছে। সন্তানদের পছন্দের খাবার কিনে দেওয়ার ইচ্ছা থাকলেও সামর্থ্য হচ্ছে না। গ্যাসের সংকটে কখনো কাঠের চুলা, কখনো কেরোসিন ব্যবহার করতে হয় বলেও জানান তিনি।
কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, সচ্ছল মানুষ পরিস্থিতি কিছুটা সামাল দিতে পারলেও নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনধারণ কঠিন হয়ে পড়েছে। গ্যাস সরবরাহ না পেয়েও বিল দেওয়ার বিষয়টি অন্যায্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, মূল্য পরিশোধের পরও সেবা না পাওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।
জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, উৎপাদন থেকে ভোক্তার কাছে পণ্য পৌঁছানো পর্যন্ত কয়েক দফা হাতবদল ও পরিবহন ব্যয়ের কারণে দাম বাড়তে পারে। তাঁর দাবি, ভোজ্যতেলের দাম সরকার নির্ধারণ করছে এবং চালের দামসহ বাজার পরিস্থিতির ওপর অধিদপ্তর নজর রাখছে। ডিমের দামও বর্তমানে ক্রেতাদের নাগালে রয়েছে বলে জানান তিনি।
দ্রব্যমূল্যের চাপ শুধু বাজারের হিসাবেই সীমাবদ্ধ নেই; তা বদলে দিচ্ছে মানুষের খাদ্যাভ্যাস, পারিবারিক জীবন ও ভবিষ্যতের পরিকল্পনা। নিম্ন ও মধ্যবিত্তের এই সংকট মোকাবিলায় বাজার তদারকির পাশাপাশি আয়-ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পণ্য সরবরাহ, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং জ্বালানি ও অন্যান্য মৌলিক সেবার সংকট সমাধান জরুরি।



