যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের ক্ষমতার লাগাম টানল ডেমোক্র্যাটরা
ঢাকা, , |
আজকের সর্বশেষ সবখবর

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের ক্ষমতার লাগাম টানল ডেমোক্র্যাটরা

জনবার্তা প্রতিবেদন
নভেম্বর ৬, ২০২৬ ১১:০৮ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরনের জয় পেয়েছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির কাছ থেকে কংগ্রেসের উভয় কক্ষ—সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। এই ফলাফল ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের বাকি সময়ে তাঁর আইন প্রণয়ন ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে বড় ধরনের রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাধা তৈরি করতে পারে।

৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের এই সাফল্যকে মার্কিন রাজনীতিতে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এটিকে সরাসরি প্রেসিডেন্টের পদে পরিবর্তন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন না; বরং কংগ্রেসের আসন, গভর্নরসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের পদে ভোট হয়।

কংগ্রেসে নিয়ন্ত্রণ হারাল রিপাবলিকানরা

নির্বাচনের আগে রিপাবলিকানদের সিনেটে ৫৩-৪৭ এবং প্রতিনিধি পরিষদেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল। এবারের ভোটে ডেমোক্র্যাটরা প্রয়োজনীয় আসন দখল করে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে নেয়। প্রতিনিধি পরিষদেও দলটি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে।

এতে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য কংগ্রেসে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। বাজেট, আইন প্রণয়ন ও প্রশাসনের ওপর নজরদারির ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাটদের ক্ষমতা বাড়বে। একই সঙ্গে কংগ্রেসের তদন্ত ও তদারকি কার্যক্রমও জোরদার হতে পারে। তবে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের ভেটো ক্ষমতা বহাল থাকায় ডেমোক্র্যাটদের সব আইন বা নীতি সহজে বাস্তবায়িত হবে—এমন নয়।

টেক্সাস-জর্জিয়াতেও ডেমোক্র্যাটদের সাফল্য

ডেমোক্র্যাটদের সাফল্য শুধু কংগ্রেসে সীমাবদ্ধ থাকেনি। দীর্ঘদিন রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত টেক্সাসে ডেমোক্র্যাট জিনা হিনোজা গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটকে পরাজিত করেছেন। একই রাজ্যে ডেমোক্র্যাট জেমস তালারিকো সিনেট নির্বাচনে জয় পেয়েছেন।

জর্জিয়ায় ডেমোক্র্যাট কেইশা ল্যান্স বটমস রিপাবলিকান রিক জ্যাকসনকে পরাজিত করে গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে দুই দশকেরও বেশি সময় পর রাজ্যটির গভর্নরের পদ ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে গেছে।

ওহাইওতেও ডেমোক্র্যাট অ্যামি অ্যাক্টন রিপাবলিকান ভিভেক রামাস্বামীকে হারিয়ে গভর্নর হয়েছেন। রাজ্যটিতে গত ১৬ বছর ধরে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ ছিল।

অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বড় ইস্যু

নির্বাচনী ফলাফলের পেছনে অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বড় ভূমিকা রেখেছে বলে ভোটার জরিপে উঠে এসেছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের ভোটার জরিপে দেখা গেছে, মূল্যস্ফীতি, খাদ্যপণ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও জ্বালানির ব্যয় নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগ ছিল ব্যাপক। প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভোটার মনে করেছেন, ট্রাম্পের নীতিগুলো অর্থনীতিকে আরও খারাপ করেছে।

ট্রাম্পের শুল্কনীতি ও ইরান যুদ্ধের প্রভাবও ভোটারদের সিদ্ধান্তে ভূমিকা রেখেছে। জরিপে অনেক ভোটার দৈনন্দিন ব্যয়ের চাপের জন্য ট্রাম্পের নীতিকে দায়ী করেছেন। বিশেষ করে টেক্সাসে মূল্যস্ফীতির কারণে গুরুতর আর্থিক চাপের কথা বলা ভোটারদের বড় অংশ ডেমোক্র্যাট জেমস তালারিকোকে সমর্থন করেছেন।

ইরান যুদ্ধও নির্বাচনে প্রভাব ফেলেছে

নির্বাচনের পর রিপাবলিকানদের পরাজয়ের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সরাসরি ইরান যুদ্ধের কথা বলেছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘আমরা হেরেছি যুদ্ধের কারণে।’ তাঁর মতে, যুদ্ধ শেষ করা, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন—এসব বিষয় ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে।

অন্যদিকে ট্রাম্প ইরান যুদ্ধের সিদ্ধান্তকে এখনও সমর্থন করেছেন। তিনি বলেছেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে ঠেকানোর জন্য ওই সিদ্ধান্ত প্রয়োজন ছিল এবং একই পরিস্থিতি হলে তিনি আবারও একই সিদ্ধান্ত নিতেন।

অভিবাসননীতিও ছিল বিতর্কের কেন্দ্রে

ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বা MAGA রাজনীতির অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল অভিবাসন। দক্ষিণ সীমান্তে কঠোর ব্যবস্থা এবং অভিবাসনবিরোধী নীতি নিয়ে তাঁর প্রশাসনের অবস্থান নির্বাচনী প্রচারণায়ও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু ছিল। তবে এবারের ভোটে অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের মতো বিষয়গুলো অনেক ভোটারের কাছে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে বলে জরিপে দেখা যায়।

মিশিগানে আবদুল আল-সাইদের জয়

মিশিগানের সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট আবদুল আল-সাইদও জয় পেয়েছেন। রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে হারিয়ে তিনি সিনেটে নির্বাচিত হয়েছেন।

এই ফলাফল ডেমোক্র্যাটদের বিভিন্ন ধরনের প্রার্থীর প্রতি ভোটারদের সমর্থনের বিষয়টিও সামনে এনেছে। তবে নির্বাচনের ফলকে শুধু একটি ইস্যু বা একটি গোষ্ঠীর ভোট দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন। বিভিন্ন রাজ্য ও নির্বাচনী এলাকায় অর্থনীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, যুদ্ধ, অভিবাসন ও কংগ্রেসের নজরদারির মতো বিষয় ভিন্নভাবে কাজ করেছে।

ট্রাম্পের জন্য নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা

মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট পদে কোনো তাৎক্ষণিক পরিবর্তন ঘটছে না। তবে কংগ্রেসের উভয় কক্ষ ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের বাকি সময় রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে গেছে।

এখন ট্রাম্প প্রশাসনের বাজেট, আইন প্রণয়ন ও বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্তে কংগ্রেসের বিরোধিতার মুখে পড়ার সম্ভাবনা বাড়বে। একই সঙ্গে প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে কংগ্রেসের তদন্ত ও নজরদারিও জোরালো হতে পারে।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের ভোটার জরিপে প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার বলেছেন, প্রেসিডেন্টের ওপর যথেষ্ট ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ নিশ্চিত করতে কংগ্রেস যথেষ্ট করছে না। ফলে এবারের ভোটে শুধু দলীয় পরিবর্তন নয়, প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার ওপর কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ জোরদারের আকাঙ্ক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

ফলে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট পদে পরিবর্তন না আনলেও তাঁর প্রশাসনের রাজনৈতিক ক্ষমতার কাঠামোয় বড় পরিবর্তন এনেছে। এখন ট্রাম্পকে ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসের সঙ্গে সমঝোতা ও বিরোধিতার নতুন বাস্তবতার মধ্যেই দ্বিতীয় মেয়াদের বাকি সময় পরিচালনা করতে হবে।