তাহসিফের মৃত্যু: রিমান্ডে দীপ, বারের তরুণীকে খুঁজছে পুলিশ
ঢাকা, , |
আজকের সর্বশেষ সবখবর

তাহসিফের মৃত্যু: রিমান্ডে দীপ, নেস্ট বারের সেই তরুণীকে খুঁজছে পুলিশ

জনবার্তা প্রতিবেদন
নভেম্বর ১, ২০২৬ ১:৪৭ অপরাহ্ণ
Link Copied!

বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরির রহস্যজনক মৃত্যুর তদন্তে নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে উত্তরার একটি রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারের সিসিটিভি ফুটেজ। নিখোঁজ হওয়ার আগে সেখানে তাহসিফের সঙ্গে এক তরুণীকে দেখা গেছে। ওই তরুণীকে শনাক্ত করে জিজ্ঞাসাবাদের চেষ্টা করছে পুলিশ। অন্যদিকে, এ ঘটনায় করা মামলায় তাহসিফের বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে চার দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, জিজ্ঞাসাবাদে দীপ দাবি করেছেন, ২৭ অক্টোবর রাতে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় ইউনিফর্ম পরা দুজন পুলিশ সদস্যকে দেখে তারা দুজন আলাদা দিকে দৌড় দেন। এ সময় ধাওয়া খেয়ে তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন। তবে ওই পুলিশ সদস্যরা কারা ছিলেন, কেন তারা ধাওয়া করেছিলেন এবং নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার পর কী ঘটেছিল—এসব বিষয়ে এখনো স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।

তদন্তকারীরা বলছেন, দীপের দেওয়া বক্তব্যে বেশ কিছু অসংগতি রয়েছে। তার বক্তব্য সিসিটিভি ফুটেজ, সাক্ষীদের তথ্য এবং অন্যান্য আলামতের সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই করা হচ্ছে। তাহসিফের ব্যবহৃত মোটরসাইকেলসহ অন্যান্য আলামত উদ্ধারের বিষয়টিও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।

সিসিটিভিতে তরুণীর সঙ্গে তাহসিফ

তদন্তে পাওয়া সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, ২৭ অক্টোবর রাত ১০টা ১৭ মিনিটে উত্তরার একটি নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারে মোটরসাইকেলে করে পৌঁছান তাহসিফ ও আনুমানিক ২৪ থেকে ২৫ বছর বয়সী এক তরুণী। তাদের সঙ্গে হেলমেট পরা অবস্থায় ছিলেন দীপও।

বারে প্রবেশের সময় ওই তরুণীর পরনে ছিল গেঞ্জি, প্যান্ট ও কেডস। তার হাতে ছিল একটি সাদা পলিথিন। ফুটেজ অনুযায়ী, তাহসিফ ও ওই তরুণী সেখানে প্রায় দেড় ঘণ্টা অবস্থান করেন। পরে তাহসিফ ও দীপ টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় যান। ওই তরুণী তাদের সঙ্গে সেখানে গিয়েছিলেন কি না, তা নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ।

পুলিশের ধারণা, মাজার বস্তি এলাকায় মাদকসেবনের অভিযোগে টহল পুলিশ তাদের ধাওয়া করে থাকতে পারে। তবে বিষয়টি এখনো নিশ্চিত নয়। গোয়েন্দা সূত্রের মাধ্যমে ওই তরুণীর ছবি সংগ্রহ করে তাকে শনাক্ত ও জিজ্ঞাসাবাদের চেষ্টা চলছে। তদন্তকারীদের ধারণা, ওই তরুণীর বক্তব্য থেকে ঘটনার আগের সময় সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

যেভাবে নিখোঁজ হন তাহসিফ

তাহসিফের স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টার দিকে দীপের ফোন পেয়ে উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের বাসা থেকে বের হন তাহসিফ। এরপর থেকে তার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না।

পরদিন ২৮ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন পেয়ে উত্তরখান থানার রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদ থেকে একটি মরদেহ উদ্ধার করে নৌপুলিশ। মরদেহের পকেটে থাকা আইফোনের মাধ্যমে সেটি তাহসিফ সাউরির বলে শনাক্ত করা হয়।

চার দিনের রিমান্ডে দীপ

তাহসিফের নিখোঁজ ও মৃত্যুর ঘটনায় বৃহস্পতিবার রাতে দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। পরে তাকে নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সংস্থাটি। শুক্রবার রাতে দীপকে নৌপুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

এরপর শুক্রবার রাত ১টার দিকে তাহসিফের বাবা কেএম এনায়েতুল করিম হেলাল উত্তরখান থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেন। ওই মামলায় দীপকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে শনিবার দুপুরে আদালতে হাজির করা হয়।

ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসিব উল্লাহ পিয়াসের আদালতে নৌপুলিশের টঙ্গী ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন তদন্তের স্বার্থে দীপকে সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, প্রাথমিক তদন্তে ঘটনার দিন তাহসিফকে মাজার বস্তি এলাকায় নিয়ে যাওয়াসহ পুরো ঘটনায় দীপের সরাসরি সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে তাহসিফের মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।

নৌপুলিশ ঢাকা রেঞ্জের পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, বাসা থেকে বের হওয়ার পর তাহসিফ কোন কোন পথে গিয়েছিলেন, কার সঙ্গে দেখা করেছিলেন এবং তার ব্যবহৃত মোটরসাইকেল কীভাবে ঘটনাস্থলে পৌঁছাল—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পুরো ঘটনার বিভিন্ন পর্যায়ে দীপের উপস্থিতি থাকায় তাকে জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে আশা করছেন তদন্তকারীরা।

তিনি আরও জানান, উদ্ধার করা মোবাইল ফোনের ফরেনসিক পরীক্ষা এবং ঘটনাস্থলের আশপাশ থেকে আলামত সংগ্রহের কাজ চলছে। তাহসিফ পুলিশের ধাওয়ায় নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো অপরাধমূলক ঘটনা রয়েছে—তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা চলছে।

দ্রুত তদন্ত ও বিচারের দাবি রাওয়ার

তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে দ্রুত সঠিক তদন্ত ও জড়িতদের শাস্তির দাবি জানিয়েছে অবসরপ্রাপ্ত সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তাদের সংগঠন রাওয়া।

শনিবার দুপুরে সংগঠনটির একটি প্রতিনিধি দল উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের রাজউক অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের ‘করবী’ ভবনে তাহসিফের বাসায় গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানায়।

রাওয়ার যুগ্ম সম্পাদক অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু নওরোজ খুরশিদ আলম এবং সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর আল আমিন বলেন, সশস্ত্র বাহিনীর সাবেক একজন কর্মকর্তার এমন মৃত্যু অত্যন্ত বেদনাদায়ক। পরিবারকে প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত পর্যবেক্ষণে রাখার আশ্বাস দেন তারা।

তদন্তকারীরা বলছেন, সিসিটিভি ফুটেজ, সাক্ষ্য, মোবাইল ফোনের ফরেনসিক প্রতিবেদন এবং রিমান্ডে পাওয়া তথ্য পর্যালোচনা করেই তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হবে।