বিশ্ব চলচ্চিত্রের বক্স অফিসে সাফল্যের কোনো নির্দিষ্ট সূত্র নেই। পরিচিত চরিত্র, জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজি, আবেগঘন গল্প কিংবা চোখধাঁধানো নির্মাণশৈলী—বিভিন্ন উপাদান মিলেই কোনো সিনেমাকে পৌঁছে দিতে পারে আয়ের শীর্ষে। হলিউডের বাইরের চীনা অ্যানিমেশন ‘নে ঝা ২’-এর সাফল্যও দেখিয়েছে, নিজস্ব সংস্কৃতি ও পুরাণভিত্তিক গল্প নিয়েও বিশ্বজুড়ে দর্শকের মন জয় করা সম্ভব।
বক্স অফিসের সর্বকালের আয়ের তালিকায় থাকা সিনেমাগুলোর দিকে তাকালে দুটি বিষয় বিশেষভাবে চোখে পড়ে। একদিকে রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজি ও পরিচিত চরিত্রের আকর্ষণ, অন্যদিকে দর্শকের সঙ্গে গল্পের আবেগগত সংযোগ। তবে শুধু পরিচিতি বা বড় বাজেট থাকলেই যে সাফল্য নিশ্চিত, তা নয়।
বিশ্বের সর্বোচ্চ আয় করা ১০ সিনেমা
মুদ্রাস্ফীতি ও টিকিটের দামের পরিবর্তন সমন্বয় না করে, বিশ্বব্যাপী প্রেক্ষাগৃহে মোট আয়ের ভিত্তিতে বক্স অফিস মোজোর ২ নভেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী শীর্ষ ১০ সিনেমা হলো—
১. ‘অ্যাভেঞ্জার্স: এন্ডগেম’ (২০১৯)—২৯৪ কোটি ২১ লাখ ডলার
২. ‘অ্যাভাটার’ (২০০৯)—২৯২ কোটি ৩৭ লাখ ডলার
৩. ‘স্পাইডার-ম্যান: ব্র্যান্ড নিউ ডে’ (২০২৬)—২৫১ কোটি ৯৫ লাখ ডলার
৪. ‘অ্যাভাটার: দ্য ওয়ে অব ওয়াটার’ (২০২২)—২৩৩ কোটি ৪৫ লাখ ডলার
৫. ‘নে ঝা ২’ (২০২৫)—২২৭ কোটি ৭ লাখ ডলার
৬. ‘টাইটানিক’ (১৯৯৭)—২২৬ কোটি ৪৮ লাখ ডলার
৭. ‘স্টার ওয়ারস: দ্য ফোর্স অ্যাওয়েকেনস’ (২০১৫)—২০৭ কোটি ১৩ লাখ ডলার
৮. ‘অ্যাভেঞ্জার্স: ইনফিনিটি ওয়ার’ (২০১৮)—২০৫ কোটি ২৪ লাখ ডলার
৯. ‘স্পাইডার-ম্যান: নো ওয়ে হোম’ (২০২১)—১৯২ কোটি ১৪ লাখ ডলার
১০. ‘জুটোপিয়া ২’ (২০২৫)—১৮৭ কোটি ৩ লাখ ডলার।
তালিকার প্রথম ছয়টি সিনেমার আয় ২০০ কোটি ডলারের বেশি। শীর্ষ ১০-এর অধিকাংশই প্রতিষ্ঠিত ফ্র্যাঞ্চাইজি বা পরিচিত গল্পের অংশ। তবে চীনা অ্যানিমেশন ‘নে ঝা ২’ এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে নির্মিত ‘টাইটানিক’ এই তালিকায় ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে।
‘অ্যাভেঞ্জার্স: এন্ডগেম’: দীর্ঘ গল্পের আবেগঘন পরিণতি
২০১৯ সালে মুক্তি পাওয়া ‘অ্যাভেঞ্জার্স: এন্ডগেম’ দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা মার্ভেল সিনেম্যাটিক ইউনিভার্সের একটি গুরুত্বপূর্ণ গল্পের পরিণতি। ২০০৮ সালে ‘আয়রন ম্যান’ দিয়ে শুরু হওয়া এই সিনেমাটিক জগতের নানা চরিত্র ও ঘটনার সূত্র একত্র হয়েছিল ছবিটিতে।
রবার্ট ডাউনি জুনিয়র, ক্রিস ইভানস, ক্রিস হেমসওয়ার্থ ও স্কারলেট জোহানসন অভিনীত ছবিটি ২০১৮ সালের ‘অ্যাভেঞ্জার্স: ইনফিনিটি ওয়ার’-এর ঘটনার পর থেকে এগিয়েছে। থানোসের আঙুলের এক চুটকিতে মহাবিশ্বের অর্ধেক প্রাণী বিলীন হওয়ার পর তাদের ফিরিয়ে আনতে অ্যাভেঞ্জারদের সময়ভ্রমণের বিপজ্জনক অভিযানে নামতে হয়।
দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত চরিত্রগুলোর সঙ্গে দর্শকের আবেগের সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। সেই গল্পের পরিণতি দেখার আগ্রহ, চরিত্রগুলোর ত্যাগ ও বিদায়ের মুহূর্ত এবং বড় পর্দার বিশেষ অভিজ্ঞতা সিনেমাটির সাফল্যে ভূমিকা রেখেছে। ২০২৬ সালের অক্টোবরে পুনরায় মুক্তির পরও ছবিটির আয় বেড়ে সর্বকালের শীর্ষে অবস্থান ধরে রেখেছে।
প্যান্ডোরার জগৎ ও ‘অ্যাভাটার’ সিরিজের আকর্ষণ
জেমস ক্যামেরনের ‘অ্যাভাটার’ সিরিজের সাফল্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো দর্শকের সামনে সম্পূর্ণ নতুন এক কাল্পনিক জগৎ তুলে ধরা। ২০০৯ সালে মুক্তি পাওয়া প্রথম ছবিতে প্যান্ডোরা গ্রহের নাভি জনগোষ্ঠী, তাদের সংস্কৃতি ও প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সংঘাতের গল্প দেখানো হয়।
সাবেক সেনাসদস্য জেক সালি প্যান্ডোরায় গিয়ে নাভি জনগোষ্ঠীর জীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হন। নেইতিরির সঙ্গে সম্পর্ক এবং প্যান্ডোরার প্রাকৃতিক সম্পদ দখলের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে অবস্থান তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়।
১৩ বছর পর মুক্তি পাওয়া ‘অ্যাভাটার: দ্য ওয়ে অব ওয়াটার’-এ প্যান্ডোরার জলজ পরিবেশ ও মেটকায়িনা জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে গল্প এগিয়েছে। পরিবার, ভালোবাসা, বিচ্ছেদ ও আত্মত্যাগের মতো সর্বজনীন বিষয় ছবিটির গল্পে জায়গা পেয়েছে। একই সঙ্গে ভিজ্যুয়াল ইফেক্ট ও বড় পর্দার প্রযুক্তিনির্ভর অভিজ্ঞতা দর্শককে আকৃষ্ট করেছে।
চীনা অ্যানিমেশনের বিশ্বজয়
তালিকায় পঞ্চম স্থানে রয়েছে চীনা অ্যানিমেশন ছবি ‘নে ঝা ২’। ২০২৫ সালে মুক্তি পাওয়া ছবিটি ২০১৯ সালের জনপ্রিয় ‘নে ঝা’-এর সিক্যুয়েল। চীনা পুরাণ ও সংস্কৃতির চরিত্রকে কেন্দ্র করে নির্মিত ছবিটি বিশ্বব্যাপী ২২৭ কোটি ডলারের বেশি আয় করেছে। এর আয়ের বড় অংশ এসেছে চীনের অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে।
এই সাফল্য দেখিয়েছে, বিশ্ব বক্স অফিসে জায়গা করে নিতে হলিউডের পরিচিত সুপারহিরো বা প্রতিষ্ঠিত ফ্র্যাঞ্চাইজিই একমাত্র ভরসা নয়। স্থানীয় সংস্কৃতি ও দর্শকের কাছে পরিচিত গল্পও বড় পরিসরে বাণিজ্যিক সাফল্য পেতে পারে।
‘টাইটানিক’: ইতিহাসের সঙ্গে প্রেমের গল্প
তালিকার ষষ্ঠ স্থানে থাকা ‘টাইটানিক’ অন্য সিনেমাগুলোর তুলনায় কিছুটা ব্যতিক্রম। জেমস ক্যামেরনের পরিচালনায় নির্মিত ছবিটি ১৯১২ সালে আটলান্টিক মহাসাগরে ডুবে যাওয়া টাইটানিক জাহাজের ঐতিহাসিক দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৈরি।
লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও ও কেট উইন্সলেট অভিনীত ছবিতে জ্যাক ও রোজের প্রেমের গল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জাহাজডুবির মর্মান্তিক ঘটনা। ইতিহাস, প্রেম, শ্রেণিবৈষম্য ও বিপর্যয়ের সমন্বয় ছবিটিকে বিশ্বজুড়ে দর্শকের কাছে পৌঁছে দেয়। শীর্ষ ১০ সিনেমার মধ্যে ‘টাইটানিক’ একমাত্র ছবি, যা সেরা চলচ্চিত্র বিভাগে অস্কার জিতেছে।
ফ্র্যাঞ্চাইজির পরিচিতি কি সাফল্যের নিশ্চয়তা?
শীর্ষ ১০ সিনেমার তালিকায় ‘টাইটানিক’ বাদে বাকি ছবিগুলো প্রতিষ্ঠিত ফ্র্যাঞ্চাইজি বা পরিচিত চরিত্রের সঙ্গে যুক্ত। ‘অ্যাভেঞ্জার্স’, ‘অ্যাভাটার’, ‘স্পাইডার-ম্যান’, ‘স্টার ওয়ারস’ ও ‘জুটোপিয়া’—সবগুলোরই আগে থেকে তৈরি দর্শকগোষ্ঠী রয়েছে।
এ ধরনের পরিচিতি নতুন সিনেমার প্রতি দর্শকের আগ্রহ তৈরি করতে পারে। তবে শুধু জনপ্রিয় চরিত্র থাকলেই যে ছবি ব্যবসায়িক সাফল্য পাবে, তা নয়। গল্পের মান, নির্মাণশৈলী, বিপণন, মুক্তির সময় এবং দর্শকের প্রত্যাশাও গুরুত্বপূর্ণ।
সুপারহিরো সিনেমার ক্ষেত্রে ‘সুপারহিরো ফ্যাটিগ’ বা একই ধরনের গল্প বারবার দেখার ক্লান্তি নিয়ে আলোচনা রয়েছে। ২০১৯ সালের পর মার্ভেলের বেশ কয়েকটি সিনেমা আগের বড় সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেনি। তবে ‘ডেডপুল অ্যান্ড উলভারিন’-এর মতো ছবির ব্যবসা দেখিয়েছে, পরিচিত চরিত্র ও নতুন গল্পের সমন্বয় এখনো দর্শক টানতে পারে।
সব মিলিয়ে সর্বোচ্চ আয়ের সিনেমাগুলোর সাফল্য বিশ্লেষণে পরিচিত চরিত্র, দীর্ঘদিনের গল্পের ধারাবাহিকতা, আবেগ, প্রযুক্তি ও দর্শকের সাংস্কৃতিক সংযোগ—সবকিছুরই ভূমিকা দেখা যায়। বড় বাজেট বা তারকানির্ভর প্রচারণা দর্শককে প্রেক্ষাগৃহে আনতে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী সাফল্যের জন্য গল্প ও দর্শকের অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ। চলচ্চিত্র ব্যবসা তাই কোনো নির্দিষ্ট গাণিতিক সূত্রে চলে না; সৃজনশীলতা ও দর্শক চাহিদার জটিল সমন্বয়ই এর মূল চালিকাশক্তি।



