বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভান্ডার: ঘি থেকে ১৮৫ ধরনের মিষ্টির সাম্রাজ্য
ঢাকা, , |
  • অন্যান্য
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ঘি থেকে মিষ্টির সাম্রাজ্য: চার প্রজন্মের ঐতিহ্যে বিক্রমপুর মিষ্টান্ন

জনবার্তা প্রতিবেদন
নভেম্বর ৩, ২০২৬ ১০:৫৫ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

একসময় তাঁদের পারিবারিক ব্যবসার মূল ভিত্তি ছিল ঘি। সময়ের সঙ্গে সেই ব্যবসার পরিধি ছাড়িয়ে তাঁরা জায়গা করে নিয়েছেন মিষ্টির জগতে। দুধ, ছানা, ক্ষীর ও চিনির সমন্বয়ে তৈরি নানা পদের মিষ্টিতে গড়ে উঠেছে তাঁদের পরিচিতি। ঘির ব্যবসা থেকে শুরু হওয়া পারিবারিক উদ্যোগটি এখন বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভান্ডার নামে পরিচিত। প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে তৈরি হয় প্রায় ১৮৫ ধরনের মিষ্টি।

মুন্সীগঞ্জের বালাশুরে উদ্যোক্তাদের পারিবারিক পূজার আয়োজনে উঠে আসে এই প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘ পথচলার নানা গল্প। তবে ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় ঘিও এখনো তাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পণ্য।

দুগ্ধজাত পণ্যের সঙ্গে ঘোষ পরিবারের সম্পর্ক বহু পুরোনো। ব্রিটিশ আমল থেকেই তাঁদের পূর্বপুরুষেরা ঘির ব্যবসা করতেন। প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান পরিচালক দীপক কুমার ঘোষ জানান, ঘির ব্যবসাকে আরও বিস্তৃত করার লক্ষ্য থেকেই মিষ্টি তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়।

পরিবারটির আদি দোকান ছিল পুরান ঢাকায়। ‘দেশপ্রিয় মিষ্টান্ন ভান্ডার’ নামের ওই দোকানে দুধ চা ও নাশতার পাশাপাশি বিশেষ ধরনের ‘প্রাণহরা’ মিষ্টি জনপ্রিয় ছিল। সাগরকলা দিয়ে তৈরি এই মিষ্টির ইতিহাস প্রায় শত বছরের পুরোনো। তবে দক্ষ কারিগরের অভাবে আগের স্বাদ ও প্রস্তুতপ্রণালি ধরে রাখা এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। একসময় দোকানটির সকালের নাশতাও বেশ জনপ্রিয় ছিল। কিন্তু সেই সময়ের প্রস্তুতপ্রণালির সঙ্গে যুক্ত অভিজ্ঞ কারিগরদের অনেকে আর বেঁচে নেই।

পরবর্তীতে ১৯৮১ সালে প্রয়াত রমেশচন্দ্র ঘোষের হাত ধরে কলাবাগানে নতুন আঙ্গিকে যাত্রা শুরু করে ‘বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভান্ডার’। ঘোষ পরিবারের বর্তমান প্রজন্মের সদস্য প্রমিত কুমার ঘোষ জানান, ঠাকুরদার বাবার সময় থেকে চলে আসা এই ব্যবসার সঙ্গে চার প্রজন্ম ধরে তাঁরা যুক্ত। বর্তমানে পরিবারের ২৪ জন সদস্য মিলে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করছেন।

১৮৫ ধরনের মিষ্টিতে বৈচিত্র্য

প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে প্রায় ১৮৫ ধরনের মিষ্টি তৈরি হয়। নিয়মিত মিষ্টির পাশাপাশি মালাই, ক্ষীর ও বিশেষ প্রণালিতে তৈরি নানা পদ ক্রেতাদের পছন্দের তালিকায় রয়েছে। এর মধ্যে রসমালাই, সরমালাই, ক্ষীরমালাই, মালাই চপ, ইন্দ্রাণী ভোগ, জাফরানি ভোগ ও কাশ্মীরি চমচম উল্লেখযোগ্য।

প্রমিত কুমার জানান, কিছু মিষ্টি সারা বছর পাওয়া যায় না। উপকরণের প্রাপ্যতা ও গুণমান বজায় রাখতে নির্দিষ্ট মৌসুমে সেগুলো তৈরি করা হয়। যেমন শীতকালে ক্ষীর কদমের চাহিদা বাড়ে। আবার কমলাভোগ তৈরিতে কমলার খোসা বেটে ছানার সঙ্গে মেশানো হয়। এ কারণে মিষ্টিটি মূলত কমলার মৌসুমেই পাওয়া যায়। পূজা-পার্বণে আবার বাড়ে লাড্ডুর চাহিদা।

প্রতিটি মিষ্টির প্রস্তুতপ্রণালি আলাদা। কোথাও ছানার নির্দিষ্ট ঘনত্ব বজায় রাখতে হয়, কোথাও ক্ষীর তৈরি করতে হয় বিশেষ যত্নে। আবার মিষ্টির রস ও স্বাদের ভারসাম্য ঠিক রাখাও জরুরি। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও কারিগরদের দক্ষতার ওপর নির্ভর করে এসব মিষ্টির স্বাদ ও গঠন।

কাঁচামালের মান ও স্বাদ ধরে রাখার চেষ্টা

মিষ্টির স্বাদ ও মান বজায় রাখতে দুধের গুণমান, ছানার ঘনত্ব এবং চিনির পরিমাণের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া হয় বলে জানান প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিধিরা। অধিকাংশ কাঁচামাল মুন্সীগঞ্জ থেকে সংগ্রহ করে কলাবাগান ও ইংলিশ রোডের কারখানায় আনা হয়।

প্রমিত কুমারের দাবি, মিষ্টি তৈরিতে তাঁরা প্রিজারভেটিভ ব্যবহার করেন না। তবে ড্রাগন সুইটস ও মাল্টি লাড্ডুর মতো কিছু পণ্যে খাবারের রং ব্যবহার করা হয়। মিষ্টির ধরন অনুযায়ী এলাচ, দারুচিনি, জায়ফল, জয়ত্রী, লবঙ্গ ও চিনিও ব্যবহৃত হয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মিষ্টির সংরক্ষণকাল উপকরণের মান, পরিচ্ছন্নতা ও চিনির পরিমাণের ওপর নির্ভর করে।

৪৫ শাখায় বিস্তৃত ব্যবসা

পারিবারিক উদ্যোগ থেকে শুরু হওয়া বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভান্ডারের ব্যবসা এখন দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে তাদের প্রায় ৪৫টি শাখা রয়েছে। সামনে আরও শাখা খোলার পরিকল্পনাও আছে।

প্রতিষ্ঠানটিতে কাজ করেন ৩০০ জনের বেশি কর্মী। তাঁদের মধ্যে শতাধিক দক্ষ কারিগর সরাসরি মিষ্টি তৈরির কাজে যুক্ত। এতগুলো শাখায় একই স্বাদ ও মান বজায় রাখা এবং কাঁচামালের গুণগত মান নিশ্চিত করাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা।

নকল পণ্য ও কারিগরি জ্ঞান ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ

ব্যবসার বিস্তারের পাশাপাশি নকল পণ্যের সমস্যাও তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ প্রতিষ্ঠানটির। প্রমিত কুমারের দাবি, তাঁদের প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী নকল মিষ্টি বিক্রি করছেন। এ ধরনের প্রায় ৩০০টি ঘটনা তাঁরা শনাক্ত করেছেন। এসব ঘটনায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন তিনি।

তবে ব্যবসার ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁদের ভাবনায় শুধু নতুন শাখা খোলাই নয়, ঐতিহ্য ও কারিগরি দক্ষতা ধরে রাখার বিষয়টিও রয়েছে। প্রাণহরার মতো পুরোনো মিষ্টির প্রস্তুতপ্রণালি হারিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে তাঁরা মনে করছেন, অভিজ্ঞ কারিগরদের জ্ঞান সংরক্ষণ, লিখিতভাবে নথিবদ্ধ করা এবং নতুন প্রজন্মকে শেখানো জরুরি।

চার প্রজন্মের অভিজ্ঞতা, প্রায় ১৮৫ ধরনের মিষ্টি এবং দেশজুড়ে শাখা বিস্তারের মধ্য দিয়ে বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভান্ডারের পথচলা এখন একটি পারিবারিক উদ্যোগের গণ্ডি ছাড়িয়েছে। ঐতিহ্যের স্বাদ ধরে রেখে সেই ব্যবসাকে পরবর্তী প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়াই এখন তাদের অন্যতম লক্ষ্য।