প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর: বিনিয়োগ ও ঋণের প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়ন হবে?
ঢাকা, , |
আজকের সর্বশেষ সবখবর

তারেক রহমানের জাপান সফর: অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও বাস্তব রূপায়ণ

জনবার্তা প্রতিবেদন
নভেম্বর ১, ২০২৬ ২:০৭ অপরাহ্ণ
Link Copied!

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবরের জাপান সফরকে কেবল চুক্তি ও আর্থিক প্রতিশ্রুতির সংখ্যা দিয়ে মূল্যায়ন করলে এর প্রকৃত তাৎপর্য বোঝা যাবে না। বরং এসব উদ্যোগ কতটা বাস্তবায়িত হয়, বিনিয়োগের পরিবেশ কতটা উন্নত হয় এবং সাধারণ মানুষের জীবনমান ও কর্মসংস্থানে কতটা প্রভাব পড়ে—সেটিই হবে সফরের সাফল্যের মূল মাপকাঠি।

সফরে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে ছয়টি সহযোগিতা দলিল স্বাক্ষরিত হয়েছে। পাশাপাশি দুটি প্রকল্পে প্রায় ২৯৫ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলারের ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে প্রায় ১০০ কোটি ৮০ লাখ ডলার এবং উপজেলা পরিচালন ও উন্নয়ন প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রায় ১৯৪ কোটি ৭০ লাখ ডলার দেওয়ার কথা রয়েছে। এ ছাড়া সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদারে টহল জাহাজ সরবরাহের জন্য ২১২ কোটি ইয়েন বা প্রায় ১ কোটি ৩৪ লাখ ডলারের অনুদান চুক্তি হয়েছে।

এখানে ঋণ ও অনুদানের পার্থক্য স্পষ্ট রাখা জরুরি। ঋণের ক্ষেত্রে অর্থ পরিশোধের দায় ও শর্ত থাকে, অন্যদিকে অনুদানের আর্থিক কাঠামো ভিন্ন। তাই কত অর্থের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেল, তার পাশাপাশি জানতে হবে ঋণের শর্ত কী, অর্থ কোথায় ব্যয় হবে এবং প্রকল্পগুলো কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হবে। এসব প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে প্রতিশ্রুতির প্রকৃত অর্থনৈতিক মূল্য।

সফরের অন্যতম আলোচিত বিষয় জাপানি বেসরকারি বিনিয়োগ। জাপানের সঙ্গে আলোচনায় আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বা প্রায় ৬৩০ কোটি মার্কিন ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণের পরিকল্পনা উঠে এসেছে। জ্বালানি, অবকাঠামো ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে এ বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। তবে এটিকে নিশ্চিত বিনিয়োগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নে জাপানি একটি দল বাংলাদেশে পাঠানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে সরকারের দায়িত্ব হবে বিনিয়োগ প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, অর্থায়নের ধরন ও সময়সীমা পর্যায়ক্রমে জনসমক্ষে প্রকাশ করা। বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি যেন কেবল ঘোষণায় সীমাবদ্ধ না থাকে, সে জন্য প্রয়োজন নিয়মিত তদারকি ও জবাবদিহি।

পোশাকশিল্পেও জাপানি বিনিয়োগের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী ইউনিক্লোর সঙ্গে আলোচনায় কৃত্রিম তন্তু, বিশেষায়িত বস্ত্র ও পরিবেশবান্ধব পোশাক উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। বাংলাদেশের পোশাকশিল্প দীর্ঘদিন ধরে তৈরি পোশাক রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল। এখন প্রয়োজন পণ্যের বৈচিত্র্য, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও মূল্য সংযোজন বাড়ানো। এ ক্ষেত্রে কৃত্রিম তন্তু ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ উচ্চমূল্যের পণ্য তৈরির সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। তবে আলোচনাকে বিনিয়োগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।

জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন (জেবিআইসি) ঢাকায় কার্যালয় স্থাপনের প্রস্তাবও বিনিয়োগ সহযোগিতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে কী ধরনের প্রকল্পে অর্থায়ন ও পরামর্শ পাওয়া যাবে, তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে উপজেলা পরিচালন ও উন্নয়ন প্রকল্পকে শুধু অবকাঠামো নির্মাণে সীমাবদ্ধ না রেখে স্থানীয় প্রশাসনের দক্ষতা, প্রশিক্ষণ, মান নিয়ন্ত্রণ ও রক্ষণাবেক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

সামুদ্রিক নিরাপত্তার জন্য টহল জাহাজ সরবরাহের উদ্যোগের ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। জাহাজ পাওয়ার পাশাপাশি এর পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষিত জনবল এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ব্যয় নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে প্রাপ্ত অনুদানের প্রত্যাশিত সুফল ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।

কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও তথ্যের নির্ভুলতা গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ও জাপানের সম্পর্ক ২০২৩ সালের এপ্রিলেই কৌশলগত অংশীদারত্বে উন্নীত হয়েছিল। এবারের সফর সেই বিদ্যমান অংশীদারত্বের ভিত্তিতে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করার উদ্যোগ। ফলে সফরকে সম্পর্কের নতুন মর্যাদা অর্জনের পরিবর্তে বিদ্যমান সম্পর্ককে কার্যকর করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা অধিকতর যথাযথ।

বিনিয়োগ বাড়াতে হলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিবেশেও পরিবর্তন আনতে হবে। কর, শুল্ক, লাইসেন্সিং ও অনুমোদন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং নির্দিষ্ট সময়সীমা নিশ্চিত করা জরুরি। ব্যবসায়ীদের জন্য নীতিগত নিশ্চয়তা, জমি ও অবকাঠামো সুবিধা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো গেলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়তে পারে।

অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি বা ইপিএ কার্যকর করার ক্ষেত্রেও প্রস্তুতি জরুরি। বাজারে প্রবেশাধিকার পেলেই রপ্তানি বাড়বে, এমন নিশ্চয়তা নেই। পণ্যের গুণগত মান, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ, পরীক্ষাগার সক্ষমতা এবং উৎপাদনকারীদের কারিগরি দক্ষতা বাড়াতে হবে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য পণ্যভিত্তিক নির্দেশনা ও প্রস্তুতিমূলক সহায়তা প্রয়োজন।

রোহিঙ্গা সংকটের ক্ষেত্রেও জাপানের সঙ্গে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। মানবিক সহায়তার পাশাপাশি স্বেচ্ছামূলক, নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন প্রয়োজন। তবে এ বিষয়ে রাজনৈতিক সমর্থন পাওয়া আর প্রত্যাবাসনের বাস্তব অগ্রগতি এক বিষয় নয়। কার্যকর সমাধানের জন্য মিয়ানমারের পরিস্থিতি ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ।

আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে সরকারের উচিত সফরে স্বাক্ষরিত দলিল ও ঘোষিত প্রকল্পগুলোর জন্য একটি প্রকাশ্য বাস্তবায়ন তালিকা তৈরি করা। সেখানে প্রতিটি উদ্যোগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা, অর্থায়নের ধরন, সময়সীমা, অগ্রগতি এবং প্রত্যাশিত নাগরিক সুবিধা উল্লেখ থাকা প্রয়োজন। এতে জনগণ যেমন অগ্রগতি জানতে পারবে, তেমনি প্রকল্প বাস্তবায়নে জবাবদিহিও নিশ্চিত হবে।

ড. এ কে এম আহসান উল্লাহর পর্যবেক্ষণের মূল কথাও হলো, কূটনৈতিক সাফল্যের চূড়ান্ত মূল্যায়ন হতে হবে সাধারণ মানুষের জীবনে তার দৃশ্যমান প্রভাব দিয়ে। জাপান সফরে পাওয়া ঋণ, অনুদান ও বিনিয়োগের সম্ভাবনা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে প্রয়োজন দক্ষ প্রশাসন, স্বচ্ছতা, উৎপাদনশীল বিনিয়োগ এবং সময়মতো বাস্তবায়ন। শেষ পর্যন্ত সফরের সাফল্য নির্ভর করবে প্রতিশ্রুতিগুলো কতটা বাস্তব ফলাফলে রূপ নেয়, তার ওপর।