সিলেটের শ্রমিক হাটে কাজের সংকট, বাড়ছে বেকার শ্রমিকের সারি
ঢাকা, , |
আজকের সর্বশেষ সবখবর

সিলেটের শ্রমিক হাটে কাজের সন্ধানে দীর্ঘ হচ্ছে বেকার শ্রমিকের সারি

জনবার্তা প্রতিবেদন
অক্টোবর ৩০, ২০২৬ ৭:১৮ অপরাহ্ণ
Link Copied!

ভোর হলেই সিলেট নগরীর বিভিন্ন সড়কের পাশে জড়ো হন দিনমজুরেরা। উদ্দেশ্য একটাই—দিনের জন্য একটি কাজ পাওয়া। কিন্তু শ্রমিকের সংখ্যা বাড়লেও কাজের সুযোগ কমছে। ফলে সকাল থেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেককে ফিরতে হচ্ছে খালি হাতে।

নগরীর মদিনা মার্কেট এলাকার এমনই এক শ্রমিক হাটে প্রতিদিন কাজের আশায় আসেন ৪৩ বছর বয়সী রোশনা বেগম। পরিবারের অভাব দূর করতে প্রায় ১০ বছর ধরে স্বামীর পাশাপাশি দিনমজুরের কাজ করছেন তিনি। কাজ পেলে দৈনিক মজুরি পান ৬০০ টাকা। এর মধ্যে দুপুরের খাবার কিনতেই খরচ হয় প্রায় ১০০ টাকা। আর কাজ না পেলে সেদিন কোনো আয় ছাড়াই বাড়ি ফিরতে হয় তাঁকে।

রোশনার তিন সন্তান। একসময় দৈনিক মাত্র ২৫ টাকা মজুরিতে কাজ করেছেন তিনি। নিজের কষ্টের মধ্যেও সন্তানদের পড়াশোনা করানোর স্বপ্ন দেখেছেন। তাঁর বড় মেয়ে স্নাতক শেষ করেও চাকরি পাননি; পরে বিয়ে দিয়েছেন। ছেলে এখন উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পড়ছে। সন্তানদের পড়াশোনা ও সংসারের খরচ চালাতে এখনো স্বামী-স্ত্রী দুজনকেই শ্রম বিক্রি করতে হচ্ছে। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়েও দুশ্চিন্তায় থাকেন রোশনা।

শুধু মদিনা মার্কেট নয়, সিলেট নগরীর আম্বরখানা, বন্দরবাজার, উপশহর, শিবগঞ্জ, টিলাগড় ও মেডিকেল রোডসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন বসে শ্রমিকদের অস্থায়ী হাট। সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নগরীর অন্তত ১০ থেকে ১৫টি পয়েন্টে ভোরে শ্রমিকেরা জড়ো হন। সকাল ৭টা থেকে ১০টা পর্যন্ত প্রতিটি স্থানে ২০০ থেকে ৩০০ শ্রমিকের উপস্থিতি দেখা যায়। তবে তাঁদের তুলনায় কাজের সুযোগ সীমিত।

বন্দরবাজার এলাকার নির্মাণশ্রমিক বশির মিয়া ৩৫ বছর ধরে এ পেশায় যুক্ত। তাঁর ভাষ্য, আগের তুলনায় এখন কাজ পাওয়া অনেক কঠিন হয়ে গেছে। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থাকলেও কাজের নিশ্চয়তা নেই। প্রতিদিন কাজের আশায় হাটে এসে অপেক্ষা করতে হয়।

শ্রমিকদের মতে, কাজের সংকটের অন্যতম কারণ নির্মাণকাজে আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহার বৃদ্ধি। আগে বালু-সিমেন্ট মেশানো, মালামাল ওপরে তোলা কিংবা পানি বহনের মতো কাজে অনেক শ্রমিকের প্রয়োজন হতো। এখন এসব কাজের কিছু অংশ যন্ত্রের মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে। এতে শ্রমিকের চাহিদা কমেছে।

কিশোরগঞ্জ থেকে আসা শ্রমিক বাবুল মিয়া জানান, পুরুষ শ্রমিকের দৈনিক মজুরি সাধারণত ৮০০ টাকা এবং নারী শ্রমিকের ৬০০ টাকা ধরা হলেও কাজের অভাবে অনেকে ৫০০ টাকাতেও কাজ করতে বাধ্য হন। শ্রমিকের সংখ্যা বেশি থাকায় অনেক সময় কম মজুরিতে কাজ নিতে হয়। তাঁর মতে, কাজের অভাবে অনেক শ্রমিক সপ্তাহের বেশির ভাগ দিনই আয় করতে পারেন না।

অন্যদিকে নিত্যপণ্যের দাম, বাসাভাড়া, গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে শ্রমজীবী পরিবারগুলো। প্রতিদিন কাজ পাওয়া যাবে কি না, সেই অনিশ্চয়তার মধ্যেই তাঁদের সংসারের খরচ চালাতে হয়।

শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও দুর্ঘটনায় সরকারি সহায়তার বিষয়ে সিলেট আঞ্চলিক শ্রম অধিদপ্তরের শ্রম কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন জানান, কোনো শ্রমিক দুর্ঘটনার শিকার হলে আবেদন করে সরকারি অনুদান পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ জন্য নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় মন্ত্রণালয়ে আবেদন জমা দিতে হয়।

কাজের অনিশ্চয়তা, কম মজুরি ও জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয়ের চাপে সিলেটের শ্রমিক হাটগুলোতে প্রতিদিন দীর্ঘ হচ্ছে অপেক্ষার সারি। শ্রমিকদের কাছে প্রতিটি সকাল তাই শুধু কাজের সন্ধান নয়, পরিবারের খাবার ও সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার আরেকটি লড়াই।