ই-রিকশা চলাচলে নতুন বিধিমালা: গতি, নিবন্ধন ও ফি নির্ধারণ
ঢাকা, , |
আজকের সর্বশেষ সবখবর

এক এনআইডিতে পাঁচ ই-রিকশা, নিবন্ধন ফি সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা

জনবার্তা প্রতিবেদন
অক্টোবর ৩০, ২০২৬ ৭:২৫ অপরাহ্ণ
Link Copied!

সিটি করপোরেশন এলাকায় ব্যাটারিচালিত তিন চাকার রিকশা বা ই-রিকশা চলাচল নিয়ন্ত্রণে নতুন বিধিমালা জারি করেছে সরকার। নতুন নিয়মে যানবাহনের গতিসীমা, নিবন্ধন, যাত্রী ধারণক্ষমতা, চলাচলের রুট, পার্কিং ও ব্যাটারি ব্যবস্থাপনার বিষয়ে নির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নিবন্ধন ছাড়া ই-রিকশা চালানো এবং নিষিদ্ধ সড়কে চলাচলও নিয়মবহির্ভূত হিসেবে গণ্য হবে।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ ‘সিটি করপোরেশন এলাকায় তিন চাকার স্বল্পগতির ব্যাটারিচালিত রিকশা (ই-রিকশা) চলাচল বিধিমালা, ২০২৬’ শিরোনামে প্রজ্ঞাপন জারি করে। একই দিন এটি বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। বিধিমালাটি দেশের সব সিটি করপোরেশন এলাকায় চলাচলকারী ই-রিকশার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে এবং অবিলম্বে কার্যকর হয়েছে।

কোথায় চলতে পারবে না ই-রিকশা

নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, জাতীয় মহাসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং প্রধান বাস চলাচলের সড়ক বা করিডোরে ই-রিকশা চলাচল নিষিদ্ধ। কর্তৃপক্ষ যেসব সড়ককে ঝুঁকিপূর্ণ বা নিষিদ্ধ ঘোষণা করবে, সেখানেও এসব যান চলতে পারবে না। ফুটপাতেও ই-রিকশা চালানো যাবে না।

এক সিটি করপোরেশনে নিবন্ধিত ই-রিকশা অন্য সিটি করপোরেশন এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে চালানো যাবে না। সিটি করপোরেশন সরকারের পূর্বানুমোদন নিয়ে ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গে পরামর্শ করে নিজ এলাকায় বা নির্দিষ্ট জোনে কতসংখ্যক ই-রিকশা চলবে, তা নির্ধারণ করতে পারবে।

সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ২৫ কিলোমিটার

ই-রিকশার সাধারণ সর্বোচ্চ গতিসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ঘণ্টায় ২৫ কিলোমিটার। তবে স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, ধর্মীয় উপাসনালয় ও জনবহুল এলাকায় সর্বোচ্চ গতি হবে ঘণ্টায় ১৫ কিলোমিটার। প্রতিটি ই-রিকশায় স্পিডোমিটার ও ওডোমিটার থাকা বাধ্যতামূলক।

চালানোর সময় মুঠোফোন ব্যবহার, নিয়মবহির্ভূত ওভারটেকিং ও লেন পরিবর্তন করা যাবে না। যাত্রীর সঙ্গে বহনযোগ্য ব্যক্তিগত মালামাল ছাড়া অন্য বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহনেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ই-রিকশাকে নির্ধারিত লেন ও রুট মেনে চলতে হবে।

নিবন্ধন, ফি ও যাত্রীসংখ্যা

নতুন বিধিমালায় ই-রিকশার নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আবেদন পাওয়ার ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে কর্তৃপক্ষ নিবন্ধন দেবে। নিবন্ধনের মেয়াদ হবে পাঁচ বছর। প্রতিটি নিবন্ধিত ই-রিকশার জন্য কিউআর কোডযুক্ত স্বতন্ত্র নম্বরপ্লেট দেওয়া হবে, যা যানবাহনের দৃশ্যমান স্থানে রাখতে হবে।

বিধিমালায় নিবন্ধন ও নবায়ন ফিও নির্ধারণ করা হয়েছে। দুই যাত্রী ধারণক্ষমতার ই-রিকশার এককালীন নিবন্ধন ফি ৮ হাজার টাকা এবং বার্ষিক নবায়ন ফি ৪ হাজার টাকা। চার যাত্রী ধারণক্ষমতার ই-রিকশার নিবন্ধন ফি ১০ হাজার টাকা এবং বার্ষিক নবায়ন ফি ৫ হাজার টাকা। ফিটনেস সনদের জন্য ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার টাকা।

একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে সর্বোচ্চ পাঁচটি ই-রিকশা নিবন্ধন নেওয়া যাবে। চালককে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে এবং বয়স কমপক্ষে ১৮ বছর হতে হবে। চালক ছাড়া যানটির অনুমোদিত ধারণক্ষমতা অনুযায়ী সর্বোচ্চ দুই বা চারজন যাত্রী বহন করা যাবে।

বুয়েটের মান ও ফিটনেস বাধ্যতামূলক

প্রতিটি ই-রিকশাকে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নির্ধারিত প্রযুক্তিগত মানদণ্ড ও নিরাপত্তাবৈশিষ্ট্য পূরণ করতে হবে। নিবন্ধনের তারিখ থেকে ই-রিকশার আয়ুষ্কাল নির্ধারণ করা হয়েছে ১২ বছর। ফিটনেস সনদের মেয়াদ হবে পাঁচ বছর এবং নবায়নের সময় নতুন করে ফিটনেস পরীক্ষা দিতে হবে।

আগে থেকে চলাচল করা ই-রিকশাগুলোকেও বুয়েটের নির্ধারিত মান অনুযায়ী কাঠামোগত পরিবর্তন করে অনুমোদন নিতে হবে। নিবন্ধনের আবেদনের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্রের সত্যায়িত অনুলিপি, দুই কপি পাসপোর্ট আকারের সত্যায়িত ছবি, ফি জমার রসিদ ও ফিটনেস সনদ জমা দিতে হবে।

ব্যাটারি চার্জিং ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় শর্ত

ই-রিকশার ব্যাটারি চার্জ করতে হবে সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক বিভাগের অনুমোদিত নির্ধারিত পার্কিং বা গ্যারেজে। চার্জিং স্টেশনে সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ব্যবহারের অযোগ্য ব্যাটারি খোলা জায়গা, মাটি, জলাশয় বা সাধারণ বর্জ্যের সঙ্গে ফেলা যাবে না। নতুন ব্যাটারি কেনার সময় পুরোনো ব্যাটারি বিক্রেতার কাছে ফেরত দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান ব্যাটারি ভাঙা বা গলানোর কাজ করতে পারবে না।

উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন ও বাস্তবায়ন

ই-রিকশা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর নকশা ও প্রযুক্তিগত মান যাচাই করে অনুমোদনের সুপারিশ দিতে স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে একটি কমিটি কাজ করবে। এতে সিটি করপোরেশন, ট্রাফিক পুলিশ, জেলা প্রশাসন ও বুয়েটের প্রতিনিধিরা থাকবেন। অনুমোদিত মানের ই-রিকশা কেনার ক্ষেত্রে তফসিলি ব্যাংক বা সরকারি প্রতিষ্ঠান ঋণসুবিধা দিতে পারবে।

বিধিমালা বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক বিভাগকে। তারা যৌথভাবে এলাকাভিত্তিক রুট নির্ধারণ ও চলাচল নিয়ন্ত্রণ করবে। বিধিমালা অমান্য করে চলাচলকারী ই-রিকশা থামানোর ক্ষমতাও সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের রয়েছে।

বাস্তবায়ন নিয়ে চ্যালেঞ্জ

নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান সরকারের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, অলিগলিতে ছড়িয়ে থাকা বিপুলসংখ্যক ই-রিকশাকে নিয়মের আওতায় আনতে সুনির্দিষ্ট সময়সীমা ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা প্রয়োজন। পর্যায়ক্রমে ই-রিকশাকে বিমার আওতায় আনার বিষয়েও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

বিধিমালার সফল বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় জরুরি বলে মনে করেন এই নগর পরিকল্পনাবিদ।

নতুন বিধিমালার ফলে সিটি করপোরেশন এলাকায় ই-রিকশা চলাচল আরও নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যে আসার কথা। তবে পুরোনো যানবাহনের নিবন্ধন, নির্ধারিত রুট বাস্তবায়ন এবং চালক-মালিকদের নতুন নিয়ম সম্পর্কে অবহিত করার ওপরই এর কার্যকারিতা অনেকটা নির্ভর করবে।