দিল্লিতে মসজিদ ঘিরে উচ্ছেদ, অনিশ্চয়তায় ৭১৭ পরিবার
ঢাকা, , |
আজকের সর্বশেষ সবখবর

দিল্লিতে মসজিদ ঘিরে উচ্ছেদ, অনিশ্চয়তায় ৭১৭ পরিবার

জনবার্তা প্রতিবেদন
নভেম্বর ৩, ২০২৬ ৩:৫২ অপরাহ্ণ
Link Copied!

জনবার্তা ডেস্ক

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির অভিজাত রেসকোর্স এলাকায় উচ্ছেদ অভিযানে ঘরবাড়ি হারিয়েছেন ৭১৭টি পরিবারের সদস্যরা। গত ৭ অক্টোবর সরকারি জমিতে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগে তিনটি বসতি গুঁড়িয়ে দেয় কর্তৃপক্ষ। উচ্ছেদের পর পরিবারগুলোকে শহরের উপকণ্ঠে সাভদা ঘেভরা পুনর্বাসন এলাকায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে নতুন এলাকায় গিয়ে কর্মসংস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও যাতায়াত নিয়ে নানা সংকটে পড়েছেন তাঁরা।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারি বাসভবনের কাছাকাছি অবস্থিত রেসকোর্স এলাকার এসব বসতিতে কয়েক প্রজন্ম ধরে নিম্ন আয়ের মানুষ বসবাস করতেন। তাঁদের অনেকে আশপাশের অভিজাত বাড়ি, ক্লাব ও প্রতিষ্ঠানে গাড়িচালক, পরিচ্ছন্নতাকর্মী এবং বাগান পরিচর্যাকারী হিসেবে কাজ করতেন।

উচ্ছেদের পর তাঁদের নতুন আবাসস্থল সাভদা ঘেভরা আগের বসতি থেকে প্রায় ৩১ মাইল দূরে। ফলে পুরোনো কর্মস্থল, সন্তানদের স্কুল এবং পরিচিত সামাজিক পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন অনেকেই।

মসজিদের মালিকানা নিয়ে বিরোধ

উচ্ছেদ অভিযানে এলাকাটির একটি ঐতিহাসিক মসজিদও আলোচনায় এসেছে। দিল্লি ওয়াক্‌ফ বোর্ডের দাবি, মসজিদটির বয়স প্রায় ৩০০ বছর। তবে অন্য কিছু হিসাবে এর বয়স ১২৫ থেকে ১৫০ বছরের মধ্যে। ওয়াক্‌ফ বোর্ডের নথি অনুযায়ী, ১৯৭৭ সালে মসজিদটি নিবন্ধিত হয়। অন্যদিকে সরকারের দাবি, মসজিদটি সরকারি জমিতে অবস্থিত।

বর্তমানে মসজিদটির পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে এবং মুসল্লিদের প্রবেশে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। নিরাপত্তাঝুঁকির কথা উল্লেখ করে সেখানে নামাজ আদায়েও বাধা দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় মুসল্লিরা।

গত আগস্টে নিরাপত্তার যুক্তিতে আদালত সরকারের অবস্থানে হস্তক্ষেপ করেননি। তবে ২৯ অক্টোবরের শুনানিতে দিল্লি হাইকোর্ট নির্দেশ দেন, ওয়াক্‌ফ বোর্ডের আপত্তি পর্যালোচনার সময় আগামী চার সপ্তাহ মসজিদটির বিষয়ে নতুন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না। মসজিদে নামাজ আদায়ে বাধা এবং স্থাপনাটি ভেঙে ফেলার আশঙ্কা জানিয়ে এক মুসল্লিও আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। এ বিষয়ে পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য রয়েছে ১৬ ডিসেম্বর।

পুরোনো জীবনের স্মৃতি, নতুন এলাকার সংকট

৫০ বছর বয়সী গাড়িচালক মোহাম্মদ ওয়াসিমের পরিবার কয়েক প্রজন্ম ধরে রেসকোর্স এলাকায় বসবাস করেছে। তিনি জানান, তাঁর বাবা ও মেয়ের বিয়ে হয়েছিল ওই মসজিদে। এখন বাড়িঘর হারিয়ে পুরোনো এলাকার স্মৃতি নিয়েই দিন কাটছে তাঁদের। মসজিদে নামাজ পড়তে যেতে চাইলেও নিরাপত্তারক্ষীরা তাঁকে বাধা দেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

গৃহকর্মী রেখা এবং বাবলুর মতো নিম্ন আয়ের মানুষেরাও জীবিকা নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। আগে আশপাশের এলাকায় ছোটখাটো কাজ করে সংসার চালাতেন তাঁরা। এখন দূরে চলে যাওয়ায় পুরোনো কর্মস্থলে যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়েছে। বাবলু জানান, আগে তিনি রেসকোর্স এলাকার একটি ক্লাবে কাজ করতেন। নতুন জায়গা থেকে দূরে গিয়ে কাজ খুঁজতে হচ্ছে তাঁকে।

নগর গবেষক ও আবাসন বিশেষজ্ঞ মুক্তা নায়েকের মতে, এ ধরনের উচ্ছেদ মানুষের জীবনযাত্রার ভারসাম্য নষ্ট করে। নতুন এলাকায় গিয়ে পুরোনো কর্মসংস্থানের নেটওয়ার্ক হারিয়ে ফেলেন বাসিন্দারা। বিশেষ করে নিরাপত্তা ও যাতায়াতের সমস্যায় নারীদের কাজের সুযোগ কমে যায়।

৬৩ বছর বয়সী নাঈম খান জানান, তাঁর দুই নাতি শ্রবণ ও বাক্‌প্রতিবন্ধী। তাদের বিশেষ চিকিৎসার প্রয়োজন হলেও নতুন এলাকায় সেই সুবিধা পাওয়া কঠিন। তাঁর পরিবার এখন একটি কক্ষে গাদাগাদি করে বসবাস করছে। ১৯ বছর বয়সী ছেলেও সেখানে কাজ পাচ্ছেন না বলে জানান তিনি।

বয়স্ক বিধবা আখতারির জীবনেও উচ্ছেদের প্রভাব পড়েছে। আগের এলাকায় পানির বোতল সংগ্রহ ও গৃহস্থালির ছোটখাটো কাজ করে তিনি সংসার চালাতেন। নতুন এলাকায় গিয়ে কাজ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে তাঁর।

পুনর্বাসন নিয়ে প্রশ্ন

দিল্লি সরকারের দাবি, সাভদা ঘেভরা এলাকায় স্কুল ও চিকিৎসাকেন্দ্রের মতো প্রয়োজনীয় সুবিধা রয়েছে। তবে উচ্ছেদ হওয়া বাসিন্দাদের অভিযোগ, নতুন এলাকার এসব সুবিধা তাঁদের আগের জীবনের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক যোগাযোগের ঘাটতি পূরণ করতে পারছে না।

বাসিন্দারা উচ্ছেদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দিল্লি হাইকোর্টে আবেদন করেছিলেন। তাঁদের যুক্তি ছিল, কর্মস্থল, সন্তানদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং দীর্ঘদিনের পরিচিত পরিবেশ থেকে এত দূরে সরিয়ে নিলে জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।

উচ্ছেদ ও পুনর্বাসন নিয়ে একাধিক সরকারি দপ্তরের কাছে মন্তব্য চাওয়া হলেও প্রতিবেদন তৈরির সময় কোনো পক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে মসজিদটির ভবিষ্যৎ এবং বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন নিয়ে আইনি ও সামাজিক অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।