হার্ভার্ডে ভর্তি প্রতারণার পর পাকিস্তানি তরুণীর মৃত্যু
ঢাকা, , |
আজকের সর্বশেষ সবখবর

হার্ভার্ডে ভর্তির প্রতারণার পর তরুণীর মৃত্যু, পাকিস্তানে তদন্ত চলছে

জনবার্তা প্রতিবেদন
নভেম্বর ৩, ২০২৬ ৩:৩৪ অপরাহ্ণ
Link Copied!

জনবার্তা ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির স্বপ্ন দেখেছিলেন পাকিস্তানের ২৪ বছর বয়সী লাইবা ইজাজ। কিন্তু সেই স্বপ্নকে পুঁজি করে প্রতারণার অভিযোগে পরিবারের কাছ থেকে লাখ লাখ রুপি হাতিয়ে নেওয়ার পর ইসলামাবাদে নিজ বাড়ির কাছেই মৃত অবস্থায় পাওয়া যায় তাঁকে। গত ৯ অক্টোবর তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনাটির তদন্ত এখনো চলছে।

আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাথমিক ময়নাতদন্তের তথ্যে লাইবার আত্মহত্যার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে তাঁর পরিবার এ ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছে। পরিবারের দাবি, প্রতারণার সঙ্গে জড়িত নোমান নামের ব্যক্তিই লাইবাকে হত্যা করেছেন। যদিও এ অভিযোগের পক্ষে চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন এখনো প্রকাশিত হয়নি।

মেধাবী শিক্ষার্থী ছিলেন লাইবা

লাইবা ইজাজ ইসলামাবাদের ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি থেকে পদার্থবিজ্ঞানে পড়াশোনা শেষ করেন এবং স্বর্ণপদক অর্জন করেন। তিনি একটি স্কুলে বিজ্ঞান বিষয়ে শিক্ষকতা করতেন। পাশাপাশি দ্বিতীয় থেকে ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বাড়িতে গিয়ে পড়াতেন।

পরিবারের চার মেয়ের মধ্যে লাইবা ছিলেন ছোট। তাঁর বাবা রানা মুহাম্মদ ইজাজ ইসলামাবাদের জি-১০ এলাকায় একটি দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের দোকান চালান। মেয়ের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণে তিনি নিজের জমি ও পরিবারের গয়না বিক্রি করে অর্থ জোগাড় করেছিলেন।

ভুয়া পরিচয় ও হার্ভার্ডে ভর্তির প্রলোভন

লাইবার বাবা ইজাজের ভাষ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরুতে ইসলামাবাদের ব্লু এরিয়া এলাকার একটি কল সেন্টারে কাজ করার সময় নোমান নামের ওই ব্যক্তির সঙ্গে লাইবার পরিচয় হয়। পরে নোমান তাঁদের দোকানে যাতায়াত শুরু করেন। তিনি নিজেকে সুপ্রিম কোর্টের কর্মী পরিচয় দিয়ে একটি পরিচয়পত্রও দেখান।

একপর্যায়ে নোমান লাইবাকে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। এ জন্য প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি ও আবেদনপ্রক্রিয়ার কথা বলে পরিবারের কাছ থেকে ২২ লাখ পাকিস্তানি রুপি নেন। পরে ব্যাংক হিসাবে ৭২ লাখ রুপি জমা দেখানোর প্রয়োজন বলে দাবি করেন তিনি।

মেয়ের স্বপ্ন পূরণে ইজাজ নিজের জমি বিক্রি করেন এবং পরিবারের গয়নাও বিক্রি করে অর্থ জোগাড় করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নোমান হার্ভার্ডের ভর্তির প্রস্তাব ও বৃত্তির চিঠি, যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসনসংক্রান্ত নথি, স্পনসরশিপের হলফনামা, ব্যাংক বিবরণী এবং বোস্টনগামী বিমানের টিকিটসহ বিভিন্ন কাগজপত্র দিয়েছিলেন।

জাল নথি ধরা পড়ার পর ট্র্যাজেডি

সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে নোমান পরিবারের হাতে নথিপত্র তুলে দেন। তবে অক্টোবরের শুরুতে কাগজপত্র নিয়ে সন্দেহ তৈরি হলে তাঁরা একটি ট্রাভেল এজেন্সিতে যান। সেখানে বিমানের টিকিটটি ভুয়া বলে জানানো হয়। পরে পরিবারের এক আইনজীবী প্রতিবেশী পুরো নথি পরীক্ষা করে জানান, কাগজপত্রগুলো আসল নয়।

পরিবারের ভাষ্য, ৬ অক্টোবর তাঁরা প্রতারণার বিষয়টি নিশ্চিত হন। এর তিন দিন পর, ৯ অক্টোবর নোমানের পাঠানো বার্তার পর লাইবা বাড়ি থেকে বের হন। পরিবারের সদস্যরা মোবাইল ফোনের অবস্থান শনাক্তকারী অ্যাপের সাহায্যে তাঁকে খুঁজতে গিয়ে বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে বাড়ি থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে তাঁর মরদেহ পান।

লাইবার বাবা ও ভগ্নিপতি দাবি করেছেন, তিনি আত্মহত্যা করতে পারেন না। তবে তাঁদের এ বক্তব্য এখনো তদন্তে প্রমাণিত হয়নি।

অভিযুক্তের মৃত্যু, তদন্ত অব্যাহত

লাইবার মৃত্যুর দুই দিন পর প্রতারণার অভিযোগে নোমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফও তাঁকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছিলেন। তবে ২০ অক্টোবর পুলিশ হেফাজতে থাকা অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নোমানের মৃত্যু হয়।

পুলিশের দাবি, তদন্তের প্রয়োজনে তাঁকে নিয়ে যাওয়ার সময় দুই মোটরসাইকেলে আসা চার ব্যক্তি পুলিশ দলকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল নোমানকে ছিনিয়ে নেওয়া। এ সময় নোমান গুলিবিদ্ধ হন এবং পরে হাসপাতালে মারা যান। ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদের খুঁজছে পুলিশ।

পরদিন পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি লাইবার পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন। কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নোমানের কাছ থেকে উদ্ধার করা ৫০ লাখ পাকিস্তানি রুপি পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়। তবে পরিবারের কাছে অর্থের চেয়ে মেয়ের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা এবং বিচার পাওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আলজাজিরাকে এক জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, লাইবার মৃত্যুর চূড়ান্ত ফরেনসিক ও ভিসেরা প্রতিবেদন পেতে ১৫ থেকে ২০ দিন সময় লাগতে পারে। প্রাথমিক ময়নাতদন্তে আত্মহত্যার ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করতে তদন্ত চলছে।

বিদেশে উচ্চশিক্ষার নামে প্রতারণার ঝুঁকি

ঘটনাটি পাকিস্তানে বিদেশে উচ্চশিক্ষার পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। লাহোরভিত্তিক শিক্ষা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কলেজওয়ার্কসের সহপ্রতিষ্ঠাতা নুশমিয়া সুকেরা আলজাজিরাকে বলেন, দেশটিতে এ খাতের জন্য নির্দিষ্ট সরকারি নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নেই। তাঁর মতে, কোনো প্রতিষ্ঠানই বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি নিশ্চিত করার শতভাগ নিশ্চয়তা দিতে পারে না।

ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ১৩ হাজারের বেশি পাকিস্তানি শিক্ষার্থী ভর্তি ছিলেন। ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের তুলনায় এ সংখ্যা ৭৫ শতাংশ বেশি।

লাইবার ঘটনা বিদেশে পড়াশোনার স্বপ্ন দেখা শিক্ষার্থীদের জন্য সতর্কবার্তা হয়ে উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি, বৃত্তি, ভিসা ও বিমানের টিকিটসংক্রান্ত কোনো নথি পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ওয়েবসাইট বা অনুমোদিত মাধ্যমে তা যাচাই করার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে।