বিশ্লেষণ | আন্তর্জাতিক রাজনীতি
ইসরায়েলের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হলেও রাজনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা দেখছেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তাঁর প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও মনে করছেন, নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থান এখনো শক্তিশালী। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে দেশটিতেও রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ছে। মুসলিম প্রার্থীকে ঘিরে বিতর্ক, নির্বাচনী পর্যবেক্ষণ এবং ভোটারদের মধ্যে ভীতি তৈরির আশঙ্কা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছাড়াই এগিয়ে নেতানিয়াহুর জোট
২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর ডানপন্থী ও উগ্র ডানপন্থী জোট ১২০ আসনের নেসেটে পেয়েছে ৫৩টি আসন। বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন। আর আরব দলগুলো সম্মিলিতভাবে পেয়েছে ১৯টি আসন। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৬১টি আসন।
নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ২৭টি আসন নিয়ে একক বৃহত্তম দল হয়েছে। তবে তাঁর জোটের আসনসংখ্যা সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার চেয়ে কম। ফলে নতুন সরকার গঠনে জোট সম্প্রসারণ, বিরোধী পক্ষের কোনো অংশের সঙ্গে সমঝোতা কিংবা নতুন নির্বাচনের সম্ভাবনা সামনে এসেছে।
বিরোধী জোটও এককভাবে সরকার গঠনের মতো আসন পায়নি। তাদের জন্য আরব দলগুলোর সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে এ ধরনের সমঝোতা নিয়ে বিরোধী শিবিরের মধ্যেই রাজনৈতিক মতপার্থক্য রয়েছে। ফলে নির্বাচনে এগিয়ে থেকেও সরকার গঠনের পথ নেতানিয়াহুর জন্য পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।
ট্রাম্পের সমর্থন ও নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক হিসাব
ইসরায়েলের নির্বাচনের মাত্র নয় দিন আগে, ১৮ অক্টোবর নেতানিয়াহুর প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে তিনি নেতানিয়াহুকে শক্তিশালী নেতা ও ইরান মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করেন।
নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর ট্রাম্প দাবি করেন, তাঁর সমর্থন নেতানিয়াহুর অবস্থান শক্তিশালী করতে ভূমিকা রেখেছে। তাঁর ভাষ্য, সমর্থন ঘোষণার পর নির্বাচনী পরিস্থিতির গতিপথ বদলে যায়। তবে ট্রাম্পের এই দাবির পক্ষে স্বতন্ত্রভাবে নিশ্চিত কোনো প্রমাণ নেই যে তাঁর সমর্থনই নির্বাচনের ফল পরিবর্তন করেছে।
রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালেও নেতানিয়াহুর জোট বিরোধীদের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। ফলে তিনি সরকার গঠনের আলোচনায় সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে পারেন। ইরান ইস্যু, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কও তাঁর রাজনৈতিক কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘিরে উত্তেজনা
ইসরায়েলের নির্বাচনের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রেও ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে মধ্যবর্তী নির্বাচন। এই নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণের পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসনের রাজনৈতিক অবস্থানও নতুন করে মূল্যায়িত হবে।
নির্বাচনের আগে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে ভোট পর্যবেক্ষণ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ (ডিওজে) জানিয়েছে, এবার দেশজুড়ে প্রায় এক হাজার বিভাগীয় কর্মী নির্বাচনী পর্যবেক্ষণে দায়িত্ব পালন করতে পারেন। তবে ২৮ অক্টোবর আদালতে দেওয়া বক্তব্যে বিচার বিভাগ জানিয়েছে, এ কাজে এফবিআই ও অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থার (আইসিই) কর্মীরা দায়িত্ব পালন করবেন না।
পর্যবেক্ষকেরা ভোটকেন্দ্রে পরিস্থিতি দেখবেন ও তথ্য নেবেন; আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তার মতো ভূমিকা পালন করবেন না। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও ভোটকেন্দ্রে আইসিই মোতায়েনের পরিকল্পনা নেই বলে জানানো হয়েছে। তবু কেন্দ্রীয় সরকারের নির্বাচনী পর্যবেক্ষণের পরিধি এবং ভোটারদের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষ ও নাগরিক অধিকার সংগঠন উদ্বেগ প্রকাশ করছে।
মুসলিম প্রার্থীকে ঘিরে বিতর্ক
মিশিগানের সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদকে ঘিরে মুসলিম পরিচয় ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন সামনে এসেছে। তিনি নির্বাচিত হলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম সিনেটর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁকে ‘জিহাদি’ আখ্যা দিয়ে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরেছেন। রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সও এল-সায়েদের সঙ্গে মুসলিম ব্রাদারহুডের সম্পর্ক থাকার অভিযোগ করেছেন। তবে এ ধরনের অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এল-সায়েদ নিজেও এ ধরনের সম্পর্ক অস্বীকার করেছেন।
এল-সায়েদকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রচারে ইসলাম ও সন্ত্রাসবাদকে একসঙ্গে উপস্থাপনের প্রবণতা নিয়ে মুসলিম ও আরব-আমেরিকান সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সমালোচকদের মতে, কোনো প্রার্থীর রাজনৈতিক অবস্থান বা বক্তব্যের সমালোচনা করা যেতে পারে; কিন্তু ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে তাঁকে নিরাপত্তার হুমকি হিসেবে উপস্থাপন নির্বাচনী পরিবেশকে আরও বিভক্ত করতে পারে।
ভোটারদের আস্থা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা, পর্যবেক্ষকদের ভূমিকা এবং ভোটারদের অংশগ্রহণ নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। তবে রাজনৈতিক বক্তব্য ও প্রচারণার কারণে কোনো জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভয় তৈরি হলে তা ভোটদানের আগ্রহেও প্রভাব ফেলতে পারে—এমন আশঙ্কা নাগরিক অধিকারকর্মীদের।
২০১৭ সালে আলাবামার সিনেট নির্বাচনের ওপর করা একটি গবেষণায় ভোটকেন্দ্রে পুলিশের উপস্থিতির সঙ্গে কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার সম্পর্ক পাওয়া গিয়েছিল। গবেষণাটি নির্দিষ্ট একটি নির্বাচন ও প্রেক্ষাপটের ওপর ভিত্তি করে করা; তাই এর ফলাফল সব নির্বাচন বা সব এলাকায় একইভাবে প্রযোজ্য বলে ধরে নেওয়া যায় না।
বিশেষ করে মুসলিম, আরব-আমেরিকান ও কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের মধ্যে বৈষম্য ও হয়রানির আশঙ্কা নিয়ে আলোচনা চলছে। নির্বাচনী পর্যবেক্ষণ যেন ভোটারদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার অধিকারকে বাধাগ্রস্ত না করে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এক নয়। তবে দুই দেশেই নির্বাচনের ফল, নিরাপত্তা ইস্যু, রাজনৈতিক প্রচারণা এবং নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ নিয়ে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে। ইসরায়েলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেয়েও নেতানিয়াহু ক্ষমতায় ফেরার পথ খুঁজছেন; আর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন ট্রাম্প প্রশাসনের রাজনৈতিক শক্তি ও ভবিষ্যৎ পথচলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠছে।



