অব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক গাফিলতির কারণে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সেবার মান তলানিতে ঠেকেছে। চিকিৎসকদের দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে তীব্র অসঙ্গতি এবং নির্দেশিত সেন্ট্রাল রোস্টার না মেনে দ্বৈত নীতি অনুসরণ করায় রোগীদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শিব্বীর আহমেদ প্রিন্স সম্প্রতি ভারপ্রাপ্ত আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. তনয় মজুমদারকে সমন্বিত রোস্টার তৈরির নির্দেশ দিলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। এর ফলে নারী ও পুরুষ চিকিৎসকদের জন্য পৃথক রোস্টার চালু রেখে বহির্বিভাগ, অন্তর্বিভাগ ও জরুরি বিভাগে বিশৃঙ্খলা তৈরি করা হয়েছে। ভারপ্রাপ্ত আরএমও নিজে নিয়মিত ওয়ার্ড রাউন্ড না দিয়ে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন চিকিৎসককে পাঠাচ্ছেন।
হাসপাতালে ডিউটি বণ্টনে বড় ধরনের বৈষম্যের অভিযোগ রয়েছে। প্রভাবশালী চিকিৎসকরা সপ্তাহে মাত্র দুই থেকে তিন দিন দায়িত্ব পালন করলেও অনেককে টানা ছয় দিন ডিউটি করতে হচ্ছে। নিয়মবহির্ভূতভাবে পুরুষ চিকিৎসকদের দৈনিক ১৪ ঘণ্টা এবং নারী চিকিৎসকদের ১০ ঘণ্টা ডিউটিতে বাধ্য করা হচ্ছে। এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালের ডিজিটাল বা বায়োমেট্রিক হাজিরা যন্ত্রটি অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে। এই সুযোগ নিয়ে অনেক চিকিৎসক সকাল ৯টার পরিবর্তে ১০টার পর কর্মস্থলে আসেন এবং নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই হাসপাতাল ত্যাগ করেন। ডিউটি চলাকালে জরুরি বিভাগে চিকিৎসকদের অনুপস্থিতিতে রোগীদের সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রেও বিঘ্ন ঘটছে। এর পাশাপাশি হাসপাতালের উপস্থিতি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার প্রধান হাতিয়ার ডিজিটাল (বায়োমেট্রিক) হাজিরা যন্ত্রটি দীর্ঘদিন ধরে বিকল ফেলে রাখা হয়েছে। ডিউটি চলাকালে চিকিৎসকদের বড় একটি অংশকে জরুরি বিভাগে না থেকে নিজ কক্ষে বিশ্রামে কাটাতে দেখা যায়। হাসপাতালের অবকাঠামোগত বেহাল দশাও প্রকট। হাসপাতালের প্রশাসনিক শৃঙ্খলার পাশাপাশি নিরাপত্তাবেষ্টনী নিয়েও চরম ক্ষোভ রয়েছে।
৫০ শয্যার এই হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ৭০ থেকে ৮০ জন রোগী ভর্তি থাকেন। শয্যাস্বল্পতায় অর্ধেকের বেশি রোগীকে হাসপাতালের মেঝেতে নোংরা পরিবেশে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। ওয়ার্ডের বেশিরভাগ বৈদ্যুতিক পাখা অচল থাকায় অসহ্য গরমে রোগীরা চরম কষ্ট পাচ্ছেন। ওয়ার্ড রাউন্ডে নিয়মিত অনুপস্থিতি এবং ভিন্ন ভিন্ন চিকিৎসকের মাধ্যমে সেবা প্রদানের কারণে রোগীদের শারীরিক অবস্থার পর্যবেক্ষণ ব্যাহত হচ্ছে। নিরাপত্তার বিষয়েও রোগীর স্বজনরা ক্ষুব্ধ; বিশেষত ওয়ার্ডে দায়িত্বরত আনসার সদস্যদের দুর্ব্যবহার এবং মহিলা ওয়ার্ডে পুরুষদের অবাধ বিচরণের অভিযোগ নিয়মিত পাওয়া যাচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাবে চরম ভোগান্তি ও স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়েছেন উপজেলার দূরদূরান্ত থেকে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিতে আসা হাজারো অসহায় ও নিম্নআয়ের মানুষ। ফলে রোগীদের পূর্বের চিকিৎসার ইতিহাস, বর্তমান শারীরিক অবস্থা এবং পরবর্তী চিকিৎসাসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ বিলম্বিত হচ্ছে। এর ওপর ওয়ার্ডের সিংহভাগ বৈদ্যুতিক পাখা অচল হয়ে থাকায় তীব্র গরমে স্বজনেরা বাসা থেকে টেবিল ফ্যান বয়ে এনে রোগীদের সাময়িক স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
হাসপাতালের নার্সদের বিরুদ্ধে দায়িত্ব পালনে অবহেলা এবং সময়মতো ওষুধ না দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সুপেয় পানির তীব্র সংকটের কারণে গরিব রোগীদের বাইরের দোকান থেকে চড়া দামে পানি কিনতে হচ্ছে। টিকিট কাউন্টারের ধীরগতির সেবায় শত শত মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। কোনো ধরনের দিকনির্দেশনা বা তথ্যকেন্দ্র না থাকায় প্রবীণ ও জটিল রোগীরা প্যাথলজি ও কক্ষ খুঁজতে হাসপাতালের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে দিশাহারা হয়ে ঘোরেন। এছাড়া বছরের পর বছর একই কর্মস্থলে থাকায় কতিপয় চিকিৎসক ও কর্মচারীর অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নস্যাৎ করেছে।
সম্প্রতি চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান হাসপাতালটি পরিদর্শন করে সেবার মানোন্নয়নে কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে ডা. তনয় মজুমদার জানান, তারা হাসপাতালে সুশৃঙ্খল পরিবেশ ফেরাতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছেন। ডা. শিব্বীর আহমেদ প্রিন্স জানান, দায়িত্ব নেওয়ার পর অনিয়মগুলো তার নজরে এসেছে এবং দ্রুত বায়োমেট্রিক হাজিরা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে চিকিৎসকদের বদলি বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থার এখতিয়ার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাতে থাকায় প্রশাসনিক কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সীতাকুণ্ডের সচেতন নাগরিক সমাজ ও ভুক্তভোগীরা এই পরিস্থিতির উত্তরণে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। হাসপাতালের সেবার মান ফিরিয়ে আনতে বায়োমেট্রিক হাজিরা সচল, সেন্ট্রাল রোস্টার বাস্তবায়ন এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।



