ক্রসফা/য়া/র নিয়ে আই জি পি' র মন্তব্যে টিআইবি ও অধিকারের আপত্তি
ঢাকা, , |
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ক্রসফায়ার নিয়ে আইজিপির মন্তব্যে টিআইবি ও অধিকারের কড়া আপত্তি

জনবার্তা প্রতিবেদন
অক্টোবর ২৭, ২০২৬ ১২:৩৫ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোহাম্মদ আলী হোসেন ফকিরের ‘সরকার অনুমোদন দিলে প্রয়োজনে ক্রসফায়ার করতেও পুলিশ পিছপা হবে না’—এমন বিতর্কিত মন্তব্যে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এবং মানবাধিকার সংস্থা অধিকার। সংস্থা দুটি এই বক্তব্যকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়ার অপচেষ্টা হিসেবে অভিহিত করে এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এক বিবৃতিতে বলেন, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ব্যর্থতাকে আড়াল করতে আইজিপি ক্রসফায়ারকে ঢাল হিসেবে ব্যবহারের ইঙ্গিত দিয়েছেন কিনা, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। তিনি স্পষ্ট করেন যে, পুলিশের মূল দায়িত্ব পেশাদার তদন্তের মাধ্যমে অপরাধী শনাক্ত করে আইনের কাঠামোর ভেতর বিচার নিশ্চিত করা। তিনি প্রশ্ন তোলেন, আইজিপি একই বক্তব্যে আইন ও সংবিধান অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের কথা বলছেন, আবার সরকারের অনুমতি পেলে বিচারবহির্ভূত হত্যার কথাও বলছেন। এই পরস্পরবিরোধী অবস্থান আইন ও সংবিধানের চরম লঙ্ঘন। ড. ইফতেখারুজ্জামানের মতে, কোনো সরকারের অনুমোদনের অজুহাতে নাগরিকের জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার কেড়ে নেওয়ার সুযোগ নেই। সোমবার এক বিবৃতিতে টিআইবি বলেছে, আইজিপি’র এ বক্তব্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যর্থতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা মোকাবিলার পরিবর্তে বিচারবহির্ভূত হত্যাকে অপরাধ দমনের গ্রহণযোগ্য হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠার বিপজ্জনক বার্তা দেয়। সরকারের অনুমতির শর্ত জুড়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা আইনসম্মতভাবে অপরাধ দমনে ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি কিনা, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। এর বিকল্প হিসেবে ক্রসফায়ারকে সামনে আনা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার সমাধান নয়; বরং পেশাগত দেউলিয়াত্বের দৃষ্টান্ত। সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে সুরক্ষিত আইনের আশ্রয়লাভ এবং জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার নির্বাহী সিদ্ধান্তে বাতিল করা যায় না। অভিযোগ যত গুরুতরই হোক, বিচারপ্রক্রিয়া পাশ কাটিয়ে কাউকে হত্যার এখতিয়ার পুলিশের নেই। যার দায়িত্ব বাহিনীকে আইনের মধ্যে থেকে পরিচালনা করা, তিনিই ক্রসফায়ারকে বিকল্প হিসেবে সামনে আনলে তার দায়িত্ববোধ ও নেতৃত্বের উপযুক্ততা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

অতীতের বিভিন্ন ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে টিআইবি বলেছে, সিনহা হত্যা মামলা কিংবা টেকনাফের কাউন্সিলর একরামুল হকের মৃত্যুর ঘটনার মতো বিষয়গুলো ক্রসফায়ারের ভয়াবহতাকে স্পষ্ট করেছে। টেকনাফের কাউন্সিলর একরামুল হক কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার ঘটনায় তাঁর পরিবারের প্রকাশ করা অডিও এবং হত্যার অভিযোগও ব্যাপক প্রশ্ন তুলেছিল।

এছাড়া নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ক্ষমতার অপব্যবহারের দৃষ্টান্তগুলো সবার সামনে রয়েছে। টিআইবি উল্লেখ করে, বিগত ১৪ সেপ্টেম্বর আইনমন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন সরকার সন্ত্রাস দমনে ক্রসফায়ারের পথে যাবে না। এরপরও পুলিশ প্রধানের এমন মন্তব্য পরিস্থিতির অসংগতি তৈরি করছে। সংস্থাটি আইজিপির বক্তব্য প্রত্যাহার, নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা এবং তার প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে, দায়িত্ব থেকে তাকে অপসারণের দাবিও জানানো হয়েছে। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের মামলায় সাবেক র্যা ব কর্মকর্তাদের দণ্ড আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্ষমতার অপরাধমূলক ব্যবহারের বিচারিকভাবে প্রতিষ্ঠিত উদাহরণ বলে উল্লেখ করেন তিনি। অতীতের এসব ঘটনা থেকে পুলিশ কী শিক্ষা নিয়েছে, সে প্রশ্নের উত্তর আইজিপিকেই দিতে হবে বলে মন্তব্য করেন ইফতেখারুজ্জামান। এরপরও পুলিশপ্রধান কেন সরকারের অনুমতি সাপেক্ষে ক্রসফায়ারের সম্ভাবনা সামনে আনছেন, তার ব্যাখ্যা চেয়েছে সংস্থাটি।

মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’ তাদের বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে যে, দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছর স্বৈরাচারী শাসনামলে দেশে ব্যাপকভাবে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। ওই সময়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে বাহিনীর সদস্যদের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও বিচার হয়েছে। বর্তমানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং বর্তমান বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরও ৫টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নথিবদ্ধ করেছে অধিকার। সংস্থাটি মনে করে, পুলিশ প্রধানের এই বক্তব্য মাঠপর্যায়ের সদস্যদের বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ডে প্রচ্ছন্ন ছাড়পত্র দেওয়ার শামিল। বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর ইতিমধ্যে ৫ টি বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে বলে অধিকার ডকুমেন্ট করেছে। ঐ সময়ে ভিন্নমভাবলম্বী ও রাজনৈতিক নেতা কর্মী সহ সাধারণ মানুষ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডসহ ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছিলেন। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের দায়ে বিলুপ্ত র‌্যাব (বর্তমানে এসআরবি) কে যুক্তরাষ্ট্র কালো ভালিকা ভুক্ত করে।

টিআইবি ও অধিকার—উভয় সংস্থাই পুলিশের বলপ্রয়োগের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের ওপর জোর দিয়েছে। তাদের মতে, শুধুমাত্র জীবন রক্ষার জন্য কঠোরভাবে অনিবার্য পরিস্থিতিতেই প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ করা যেতে পারে। এছাড়া, পুলিশের সমালোচনা করলে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকি প্রসঙ্গে টিআইবি জানিয়েছে, সুনির্দিষ্ট অপরাধের প্রমাণ থাকলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে, তবে ঢালাও অভিযোগ স্বাধীন গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধের ঝুঁকি তৈরি করে। আইজিপির এই বক্তব্য প্রত্যাহার এবং ঘটনার নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিচারের মুখোমুখি করার আহ্বান জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থাটি। পুলিশের কাজের পরিবেশ ও সক্ষমতা নিশ্চিত করার প্রয়োজন বৈধ সমালোচনা এড়ানোর যুক্তি হতে পারে না বলেও উল্লেখ করেছে টিআইবি।