কমিউনিস্ট স্লোগান ও জয় বাংলা: ইতিহাস ও পার্থক্য
ঢাকা, , |
আজকের সর্বশেষ সবখবর

কমিউনিস্ট স্লোগান ও জয় বাংলা: ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও পার্থক্য

জনবার্তা প্রতিবেদন
অক্টোবর ২৭, ২০২৬ ৮:২৪ অপরাহ্ণ
Link Copied!

রাজনীতির ময়দানে স্লোগান কখনো কেবল কিছু শব্দগুচ্ছ নয়। সময়ের বিবর্তনে এগুলো শ্রেণিসংগ্রাম, গণ-অভ্যুত্থান কিংবা জাতীয় মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় রূপ নেয়। প্রতিটি স্লোগানের পেছনে থাকে নির্দিষ্ট সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। তাই বামপন্থী বা কমিউনিস্ট রাজনীতির স্লোগানগুলো বুঝতে হলে কেবল সেগুলো মুখস্থ করা যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন এর পেছনের আদর্শিক ভিত্তি অনুধাবন করা। কমিউনিস্ট ও বামপন্থী রাজনীতির সামনে আজও একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে: স্লোগানের বক্তব্য বাস্তব জীবনে কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে।

কমিউনিস্ট আন্দোলনের সবচেয়ে স্বীকৃত আন্তর্জাতিক স্লোগান হলো ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’। ১৮৪৮ সালে কার্ল মার্কস ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলসের লেখা ‘কমিউনিস্ট ইশতেহার’-এর শেষ আহ্বানে এটি যুক্ত হয়েছিল। ইংরেজিতে ‘Workers of the world, unite!’ নামে পরিচিত এই স্লোগানের মূল বার্তা হলো, শ্রমিকের মুক্তি কোনো নির্দিষ্ট সীমানায় সীমাবদ্ধ নয়। পুঁজি যেমন আন্তর্জাতিক, তেমনি শ্রমিকের সংহতির প্রশ্নটিও বৈশ্বিক। তবে কমিউনিস্ট রাজনীতি কেবল একটি স্লোগানে সীমাবদ্ধ নয়। কৃষকের জমির অধিকার, সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতা, পুঁজিবাদী শোষণের নিন্দা এবং সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠনের লড়াইকে কেন্দ্র করে নানা সময় বিভিন্ন স্লোগান উঠে এসেছে। বিভিন্ন দেশ, সময় ও রাজনৈতিক সংগঠনে ব্যবহৃত স্লোগানগুলোর মধ্যে কয়েকটি বহুল পরিচিত উদাহরণ নিচে দেওয়া হলো।

‘শ্রমিক-কৃষক এক হও’ বামপন্থী রাজনীতির অন্যতম পরিচিত আহ্বান। যদিও শ্রমিক ও কৃষকের সামাজিক অবস্থান ও স্বার্থ ভিন্ন, তবুও উৎপাদন ও সম্পদের বণ্টনের প্রশ্নে তাদের অভিজ্ঞতাগুলো মিলে যায়। এই মিল থেকেই ঐক্য গড়ার ডাক আসে। আবার বাংলাদেশের বাম রাজনীতির ইতিহাসে ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় ‘কৃষক শ্রমিক অস্ত্র ধর, জনগণতন্ত্র কায়েম কর’ এবং ‘মুক্তির এই পথ, সশস্ত্র বিপ্লব’-এর মতো স্লোগানগুলো বেশ আলোচিত হয়েছিল। তবে মনে রাখা প্রয়োজন, এসব স্লোগান সব কমিউনিস্ট সংগঠনের অভিন্ন অবস্থান ছিল না, বরং নির্দিষ্ট বিপ্লবী ধারার পরিচয় বহন করত। একইভাবে শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তার দাবিগুলো বামপন্থী রাজনীতির দীর্ঘদিনের এজেন্ডা হলেও এগুলো কেবল তাদের একচেটিয়া দাবি নয়। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান ছিল নানা রাজনৈতিক ধারা ও সামাজিক শক্তির অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা একটি বৃহৎ আন্দোলন। শ্রমিক-কৃষকের সংগ্রাম, চলবেই অবিরাম।

ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনীতিতে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ বা ‘বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক’ স্লোগানটির ব্যাপক ব্যবহার দেখা গেছে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিপ্লবী ধারায় এটি ব্যবহৃত হয়েছে। তবে একে শুধু কমিউনিস্টদের স্লোগান হিসেবে গণ্ডিবদ্ধ করা ইতিহাসকে সংকীর্ণ করার শামিল।同様ভাবে, ‘ভোটের আগে ভাত চাই’-এর মতো স্লোগানগুলো মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সভা-সমাবেশে রাজনৈতিক অধিকার ও অর্থনৈতিক চাহিদার মেলবন্ধন ঘটিয়েছিল।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটি অনন্য। এটি বাঙালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, স্বাধিকার ও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু এর ঐতিহাসিক তাৎপর্য এবং কমিউনিস্ট আন্দোলনের শ্রেণিভিত্তিক স্লোগানের ধরণ ভিন্ন। ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’ আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতির প্রতিনিধিত্ব করে, আর ‘জয় বাংলা’ বাঙালির জাতীয় মুক্তির আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। যদিও মুক্তিযুদ্ধে বামপন্থী কর্মীরা অংশ নিয়েছিলেন, কিন্তু তার মানে এই নয় যে ‘জয় বাংলা’ কমিউনিস্ট মতাদর্শের নিজস্ব স্লোগান। কোনো বিশেষ দলের দীর্ঘ ব্যবহারের কারণে এর ঐতিহাসিক গুরুত্বকে দলীয় পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করাও সমীচীন নয়।

পরিশেষে, বামপন্থী রাজনীতির প্রকৃত পরীক্ষা স্লোগানে নয়, বরং তাদের আদর্শিক বাস্তবতায়। শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা, কৃষকের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সাম্প্রদায়িকতা বিরোধিতা এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহির প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থানই বলে দেয় তাদের স্লোগান কতটা অর্থবহ। বর্তমান সময়েও শ্রমিক-কৃষকের অধিকার আদায়, বৈষম্য বিলোপ এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে বামপন্থী রাজনীতির প্রাসঙ্গিকতা বজায় রয়েছে। বৈষম্যের অবসান চাই, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করো।