ক্রসফায়ার নিয়ে আইজিপির মন্তব্যে নাগরিক নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা
ঢাকা, , |
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ক্রসফায়ার নিয়ে আইজিপির মন্তব্যে নাগরিক নিরাপত্তা নিয়ে গভীর শঙ্কা

জনবার্তা প্রতিবেদন
অক্টোবর ২৭, ২০২৬ ১১:১৯ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের সাম্প্রতিক একটি বক্তব্য নাগরিকদের মনে নতুন করে ভীতির সঞ্চার করেছে।

সোমবার রাজধানীর চকবাজারে ‘কমিউনিটি ইসলামিক ব্যাংক সিস্টেম’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘ক্রসফায়ার যদি প্রয়োজন হয়, সরকার যদি অ্যালাউ করে, আমরা সেটাই করব। সেই সঙ্গে তিনি আইন ও সংবিধান অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের সুযোগ চেয়ে ‘দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত পুলিশের প্রয়োজন’—এমন দাবিও করেন। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর প্রধানের কাছ থেকে এমন বক্তব্য এমন সময়ে এল, যখন নাগরিক সমাজ পুলিশকে সংস্কার করে সেবামুখী করার প্রত্যাশা করছে। আমাদের সরকার, রাজনৈতিক দল বা প্রতিষ্ঠানগুলো যে অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে কিছুই শিখতে চায় না এবং অতীত ভুলের পুনরাবৃত্তি করার বাসনা যে ত্যাগ করতে পারে না, তা দুই দিন পরপর আমরা বুঝতে পারি। আমাদের কর্তাব্যক্তিরা বুঝিয়ে দেন, এই রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানকে তাঁরা কোনোভাবেই নাগরিক অভিমুখী করতে আগ্রহী নন।

পুলিশের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই, বরং প্রশ্ন উঠছে বাহিনীটি কীভাবে নাগরিক অধিকার রক্ষা করবে তা নিয়ে। যখনই মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি সামনে আসে, তখন বাহিনীর প্রয়োজনীয়তার কথা বলে মূল উদ্বেগকে পাশ কাটানোর চেষ্টা করা হয়। সংবিধানের ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদে স্পষ্ট বলা আছে, আইনানুযায়ী ব্যতীত জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা থেকে কাউকে বঞ্চিত করা যাবে না। তবুও ক্রসফায়ার বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পক্ষে সাফাই গাওয়া বা সরকারি প্রেসনোটের চিরাচরিত যুক্তি ব্যবহার করা রাষ্ট্রীয় বাহিনীর প্রতি মানুষের আস্থা কমিয়ে দেয়। শুরু থেকেই দুনিয়ার প্রায় সব মানবাধিকার সংগঠন এগুলোর বিরোধিতা করে অজস্র নিন্দা জ্ঞাপন করেছে। তবু সংবিধান ও দণ্ডবিধির ভাষায় এমন কিছু ফাঁকফোকর আছে, যা দিয়ে রাষ্ট্রীয় বাহিনী চাইলেই যেকোনো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে ‘বৈধ’ করে ফেলতে পারে। এ কারণেই সব আমলে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সরকারি প্রেসনোটের ভাষা ও যুক্তিকাঠামো সর্বদা সমান থাকে। ক্রসফায়ারের ঘটনা যে কেবল বিচ্ছিন্ন ব্যক্তির ‘অপরাধ’ থাকে না; বরং এটা যে পদ্ধতিগত, তারও কিছু নমুনা আমরা দেখেছি।

জুলাই অভ্যুত্থানের পর নাগরিকদের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল প্রাণের অধিকার নিশ্চিত করা। পুলিশের আইজি যখন বলেন, সরকার চাইলে তাঁরা ক্রসফায়ার করতে পারবেন, তখন তা দেশের নাগরিকদের কাছে চরম অপমানজনক ও ভীতিকর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সরকার অনুমতি দিলেই কি পুলিশ নাগরিকের প্রাণ নিতে পারে—এই প্রশ্ন এখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড যে কোনো আইনি কাঠামোর মধ্যে পড়ে না, তা ঐতিহাসিকভাবেই স্পষ্ট। আর যে প্রশ্নটি উঠছে তা হচ্ছে, তারা কি নাগরিকের জন্য সুরক্ষা বলয় তৈরি করবে, নাকি নাগরিকের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে উঠবে। পাশাপাশি গত দেড় দশকে আওয়ামী লীগের শাসনামলে এ ধরনের ঘটনার যে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ হয়েছে, তাতে রাষ্ট্র বিনা বিচারে কাউকে প্রাণে মেরে ফেলতে পারে না, সে বিষয়ে ঐকমত্যই ছিল মূল সুর। জনগণের করের টাকায় বেতনভুক্ত এবং জনগণের সেবা দেওয়ার ওয়াদা নিয়ে দায়িত্বরত একজন কর্মকর্তা যখন বিচারবহির্ভূতভাবে নাগরিককে মেরে ফেলার বাসনা প্রকাশ করেন, তা কতটা ‘অসাংবিধানিক’, অপমানজনক ও ভীতিকর, তা পাঠক সহজেই অনুমান করতে পারছেন। দ্বিতীয়ত, সরকার চাইলেই কি তিনি নাগরিকের প্রাণহানি ঘটাতে পারেন।

তদন্তের বিষয়টি নিয়ে আইজিপি জানিয়েছেন, পুলিশের ভেতরেই ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ ব্যবস্থা রয়েছে এবং সদস্যরা অপরাধ করলে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে বাস্তবে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে এমন ব্যবস্থার নজির খুব কম। সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের তথ্যমতে, ২০১৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে র‍্যাবের (বর্তমানে বিলুপ্ত ও এসআরবি হিসেবে পুনর্গঠিত) চেয়ে ডিবিসহ পুলিশের সম্পৃক্ততা ছিল বেশি (৪৮.০৫ শতাংশের বিপরীতে ৩১.৯ শতাংশ)। পুলিশের আইজি যা বলেছেন, তাতে নাগরিক হিসেবে ভীত হওয়ার এবং পুরোনো সহিংসতার স্মৃতি জেগে ওঠার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। এমনকি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে র‍্যাবের (বর্তমানে র‍্যাব বিলুপ্ত হয়ে এসআরবি হয়েছে) সম্পৃক্ততার জন্য আন্তর্জাতিক মহল থেকে অনেকবারই র‍্যাব নিষিদ্ধের সুপারিশও এসেছে।

বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড যে একটি পদ্ধতিগত সমস্যা, তার প্রমাণ পাওয়া যায় অতীতের বিভিন্ন ঘটনায়। ২০১৯ সালে টেকনাফ থানার তৎকালীন ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ‘বন্দুকযুদ্ধে’র কৃতিত্বের জন্য পুলিশের সর্বোচ্চ পদক ‘বাংলাদেশ পুলিশ পদক’ (বিপিএম) পেয়েছিলেন। তাঁর তালিকায় থাকা ছয়টি ঘটনার প্রতিটিই ছিল বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। এটি প্রমাণ করে যে বাহিনীর অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নে ক্রসফায়ার কোনো অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় না। ক্রসফায়ার বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কতটা আইনি, কতটা বেআইনি কিংবা কতটা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন, তা ২০০৪ সালের পর থেকে কখনোই তর্কের বিষয়ই ছিল না। এই উক্তি প্রমাণ করে, বাহিনীর মনস্তত্ত্ব ও প্রশাসনিক কাঠামোয় এখনো ঔপনিবেশিক মানসিকতা শিকড় গেড়ে আছে।

পুলিশ সদর দপ্তর আইজিপির বক্তব্যের ব্যাখ্যায় আত্মরক্ষার অধিকারের বিষয়টি উল্লেখ করলেও এতে এক ধরনের প্রচ্ছন্ন হুমকির আভাস পাওয়া গেছে। এমন রক্ষণশীল ও ঔপনিবেশিক মানসিকতা সংস্কারের দাবি তোলা হয়েছিল গণ-অভ্যুত্থানের পর। কিন্তু বাহিনীপ্রধানের এই আকাঙ্ক্ষা সেই সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ক্রসফায়ারের সঙ্গে র‍্যাবের নাম সব সময় উচ্চারিত হলেও পুলিশ বাহিনীও এতে জড়িত। পদক পাওয়ার জন্য তিনি পুলিশ সদর দপ্তরে যে ছয়টি কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের কথা উল্লেখ করেন, তার সব কটি ঘটনাতেই আসামি নিহত হয়েছিলেন (, ৬ আগস্ট ২০২০)।

ইতিমধ্যেই টিআইবিসহ বিভিন্ন সংস্থা আইজিপির এমন বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করেছে এবং অবিলম্বে এটি প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের নজির যখন বিরল, তখন আমাদের দেশে বাহিনীপ্রধানের প্রকাশ্যে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বর্তমান বিশ্বের বহু দেশে আন্দোলন সহিংস রূপ নিলেও কোথাও পুলিশের গুলিতে প্রাণহানির নজির সচরাচর মেলে না। অথচ আমাদের পুলিশপ্রধান নিজেই প্রকাশ্যে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের প্রকাশ্য আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করছেন।

অভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে যখন নাগরিকের জীবন ও স্বাধীনতার সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা, তখন পুলিশের শীর্ষ পর্যায় থেকে আসা এই বক্তব্য নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গিকেই প্রকাশ করে। এই মানসিকতা পরিবর্তন না হলে পুলিশকে প্রকৃত অর্থে নাগরিকবান্ধব করা কঠিন হয়ে পড়বে।