যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা জয়ী হলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ইউরোপের সম্পর্ক উন্নয়নের কিছু সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতিতে বড় পরিবর্তন আসবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং নির্বাচনের পর যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংঘাত বাড়লে ইউরোপের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে।
ইউরোপীয় পররাষ্ট্র সম্পর্ক কাউন্সিলের (ইসিএফআর) ২৮ অক্টোবর প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে এ আশঙ্কার কথা তুলে ধরা হয়েছে। বিশ্লেষণটি লিখেছেন সংস্থাটির প্যারিস কার্যালয়ের প্রধান ও জ্যেষ্ঠ নীতিবিশ্লেষক সেলিয়া বেলিন এবং জ্যেষ্ঠ নীতিবিশ্লেষক মাজদা রুগে।
কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের জয় কতটা প্রভাব ফেলবে
যুক্তরাষ্ট্রে আগামী ৩ নভেম্বর মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। নির্বাচনের আগে সম্ভাব্য ভোটারদের মধ্যে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন রিপাবলিকানদের চেয়ে প্রায় ৯ শতাংশ পয়েন্ট এগিয়ে রয়েছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার এবং সিনেটে ব্যবধান কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে দলটির।
কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেলে ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্ত, সম্ভাব্য অনিয়ম এবং পররাষ্ট্রনীতির বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে তদন্ত ও শুনানি আয়োজন করতে পারবে। এতে প্রশাসনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ হতে পারে।
তবে কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালেও প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের নির্বাহী ক্ষমতা বহাল থাকবে। শুল্ক আরোপ, সেনা প্রত্যাহার এবং বিদেশি সরকারের সঙ্গে বিভিন্ন চুক্তির মতো বিষয়ে তিনি নিজের ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারবেন। ফলে ডেমোক্র্যাটদের জয় ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতিকে তাৎক্ষণিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে—এমন সম্ভাবনা সীমিত।
ইউরোপের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংঘাত তীব্র হলে ট্রাম্প আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের অবস্থান জোরালো করার চেষ্টা করতে পারেন। এতে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে।
ইউরোপের জন্য বিশেষ উদ্বেগের বিষয় ন্যাটোর নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং মহাদেশটিতে মার্কিন সেনা উপস্থিতির ভবিষ্যৎ। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় ইউরোপকে নিজের নিরাপত্তার দায়িত্ব আরও বেশি নিতে হতে পারে। এতে ইউরোপীয় দেশগুলোর সামরিক সক্ষমতা ও প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর চাপ তৈরি হবে।
বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, ইউরোপের কিছু দেশের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের মতপার্থক্য মার্কিন সেনা উপস্থিতি নিয়ে সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেলেও এ ধরনের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে দ্রুত সমাধান নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে।
রাশিয়া ও ইউক্রেন নিয়ে আশঙ্কা
রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সমঝোতাও ইউরোপের জন্য উদ্বেগের কারণ। বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেনের ভূখণ্ডগত স্বার্থকে উপেক্ষা করে কোনো সমঝোতা হলে তা ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে।
ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠ হলে রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য চুক্তি এবং এ ধরনের সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যবসায়িক স্বার্থের ভূমিকা নিয়ে তদন্তের সুযোগ বাড়তে পারে। এতে প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক ও জনসম্মুখের জবাবদিহির চাপ তৈরি হবে। তবে তাতেও ট্রাম্পের কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত পুরোপুরি আটকে দেওয়া যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
ডেমোক্র্যাটদের ভবিষ্যৎ নীতিও ইউরোপের জন্য গুরুত্বপূর্ণ
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল ডেমোক্র্যাট পার্টির অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্যও স্পষ্ট করতে পারে। দলটির প্রগতিশীল ও মধ্যপন্থী অংশের মধ্যে পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। ফলে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক ভূমিকা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হতে পারে।
ইউরোপের নিরাপত্তা ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের আলোচনাও এখনো সীমিত। ভবিষ্যতে দলটি ক্ষমতায় ফিরলেও ইউরোপের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আগের মতো সহযোগিতা দিতে পারবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের পরামর্শ, ইউরোপের উচিত শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের ফলাফলের ওপর নির্ভর না করে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো এবং মার্কিন রাজনীতির নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা। একই সঙ্গে বাণিজ্য, ন্যাটোর দায়িত্ব ভাগাভাগি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ন্ত্রণ ও পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়ে নতুন সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয় ইউরোপের জন্য দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি বদলে যাবে বা যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ সম্পর্কের পুরোনো আস্থা ফিরে আসবে—এমন আশা করার যথেষ্ট ভিত্তি নেই।
সূত্র: ইউরোপীয় পররাষ্ট্র সম্পর্ক কাউন্সিল (ECFR)।



