জনবার্তা ডেস্ক
মানুষ কি প্রকৃতিগতভাবে মাংসাশী, নাকি নিরামিষভোজী—এ নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। কেউ মনে করেন, সুস্থ থাকতে প্রাণিজ খাবার বাদ দেওয়া উচিত। আবার কারও ধারণা, শরীরের প্রয়োজন মেটাতে নিয়মিত মাংস খাওয়া জরুরি। তবে জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিতে মানুষ মূলত সর্বভুক বা ‘Omnivore’। অর্থাৎ মানুষের শরীর উদ্ভিজ্জ ও প্রাণিজ—উভয় উৎসের খাবার গ্রহণ ও হজমের উপযোগী।
তবে সর্বভুক হওয়ার অর্থ এই নয় যে সুস্থ থাকতে প্রচুর মাংস খেতে হবে। আবার নিরামিষ খাবার খেলেই যে খাদ্যাভ্যাস স্বাস্থ্যকর হবে, তাও নয়। সুস্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো খাবারের পুষ্টিমান, বৈচিত্র্য ও ভারসাম্য।
মানুষের শরীর কি সর্বভুক হওয়ার প্রমাণ দেয়?
মানুষের বিবর্তনীয় ইতিহাসে উদ্ভিজ্জ খাবারের পাশাপাশি প্রাণিজ খাদ্য গ্রহণের প্রমাণ পাওয়া যায়। মানুষের দাঁত ও চোয়ালের গঠন বিভিন্ন ধরনের খাবার চিবানোর উপযোগী। একইভাবে পরিপাকতন্ত্রও উদ্ভিজ্জ ও প্রাণিজ খাবার হজম করতে সক্ষম।
মানুষের লালায় থাকা অ্যামাইলেজ এনজাইম শ্বেতসার ভাঙতে সাহায্য করে। অন্যদিকে পাকস্থলীর হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড ও বিভিন্ন এনজাইম প্রোটিন হজমে ভূমিকা রাখে। এসব বৈশিষ্ট্য মানুষের সর্বভুক খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এ নিয়ে প্রচলিত কিছু ধারণাও বিভ্রান্তিকর। যেমন, লালার অম্লত্ব, পাকস্থলীর অ্যাসিডের মাত্রা, অন্ত্রের দৈর্ঘ্য কিংবা ঘামের বৈশিষ্ট্য দিয়ে মানুষকে এককভাবে মাংসাশী বা তৃণভোজী হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা যায় না। ঘাম মূলত শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়া।
উদ্ভিদভিত্তিক খাবার কি স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী?
২০২৩ সালে প্রকাশিত একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনা ও মেটা-অ্যানালাইসিসে ২২ লাখের বেশি মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, উদ্ভিদভিত্তিক খাদ্যাভ্যাস অনুসরণের সঙ্গে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি ১৮ শতাংশ, হৃদ্রোগের ঝুঁকি ১০ শতাংশ এবং সব কারণে মৃত্যুর ঝুঁকি ১৬ শতাংশ কম থাকার সম্পর্ক রয়েছে।
তবে গবেষণাটি পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করেছে। তাই এই ফলাফলকে সরাসরি কারণ-ফল সম্পর্ক বা সবার ক্ষেত্রে নিশ্চিত ঝুঁকি হ্রাস হিসেবে ব্যাখ্যা করা যাবে না। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ফলমূল, শাকসবজি, পূর্ণশস্য ও ডালসমৃদ্ধ স্বাস্থ্যকর উদ্ভিদভিত্তিক খাবারের সঙ্গে উপকারের সম্পর্ক বেশি স্পষ্ট।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসে ফলমূল, শাকসবজি, ডাল, বাদাম ও পূর্ণশস্যের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। এসব খাবারে থাকা খাদ্য-আঁশ অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমে সহায়তা করে এবং সামগ্রিক পুষ্টি চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখে।
নিরামিষ খাবার খেলেই কি সুস্থ থাকা যায়?
নিরামিষাশী হলেই খাদ্যাভ্যাস স্বাস্থ্যকর হয়ে যায় না। মাংস বাদ দিয়ে অতিরিক্ত পরিশোধিত শর্করা, ভাজাপোড়া, মিষ্টি বা অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার খেলে প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাওয়া কঠিন হতে পারে।
প্রাণিজ আমিষের বিকল্প হিসেবে মসুর ডাল, মুগ ডাল, ছোলা, রাজমা, সয়াবিন, বাদাম ও বীজজাতীয় খাবার রাখা যেতে পারে। এসব খাবার প্রোটিনের পাশাপাশি খাদ্য-আঁশ ও বিভিন্ন খনিজ উপাদান সরবরাহ করে।
ভেগান খাদ্যাভ্যাসে যেসব পুষ্টির দিকে নজর জরুরি
যাঁরা সম্পূর্ণ ভেগান বা প্রাণিজ উৎসের সব খাবার বাদ দিয়ে চলেন, তাঁদের কয়েকটি পুষ্টি উপাদানের বিষয়ে বাড়তি সতর্ক থাকতে হয়। বিশেষ করে ভিটামিন বি১২, আয়রন, ক্যালসিয়াম, জিঙ্ক ও ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।
ভিটামিন বি১২ প্রাকৃতিকভাবে মূলত প্রাণিজ খাবারে পাওয়া যায়। তাই ভেগানদের ক্ষেত্রে বি১২-সমৃদ্ধ ফোর্টিফায়েড খাবার অথবা প্রয়োজন অনুযায়ী সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের বিষয়টি বিবেচনা করতে হয়। খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের আগে পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
বাংলাদেশের খাবারেই আছে পুষ্টির ভালো উৎস
বাংলাদেশে সহজলভ্য অনেক খাবার থেকেই উদ্ভিদভিত্তিক পুষ্টি পাওয়া সম্ভব। মসুর ও মুগ ডাল, ছোলা, শিম, বিভিন্ন শাকসবজি, বাদাম এবং মৌসুমি ফল স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকায় রাখা যায়। লাল চাল ও আটার রুটির মতো পূর্ণশস্যও খাদ্য-আঁশের ভালো উৎস।
খাবারের একটি ভারসাম্যপূর্ণ প্লেট সাজাতে অর্ধেক অংশ শাকসবজি ও ফল, এক-চতুর্থাংশ পূর্ণশস্য এবং বাকি এক-চতুর্থাংশ প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার রাখা যেতে পারে। প্রোটিনের উৎস হিসেবে ডাল, মাছ, ডিম, মাংস বা অন্যান্য উপযোগী খাবার বেছে নেওয়া যায়।
সবশেষে বলা যায়, মানুষ প্রকৃতিগতভাবে সর্বভুক হলেও সুস্থ থাকার জন্য মাংস খাওয়া বাধ্যতামূলক নয়। আবার শুধু নিরামিষ খাবার খেলেই সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত হয় না। বয়স, শারীরিক অবস্থা, কাজের ধরন ও ব্যক্তিগত পুষ্টি চাহিদা অনুযায়ী বৈচিত্র্যময় ও ভারসাম্যপূর্ণ খাদ্যাভ্যাসই সুস্থ থাকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।



