ন্যায্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি রূপান্তরের আহ্বানের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে তিন দিনব্যাপী ‘রিনিউয়েবল এনার্জি ফেস্ট ২০২৬’। বুধবার (২৮ অক্টোবর) বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে আয়োজিত উৎসবের সমাপনী দিনে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা উন্নয়ন এবং পরিবেশগত ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
‘একটি ন্যায্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সবুজ জ্বালানি রূপান্তর’ প্রতিপাদ্যে দেশে দ্বিতীয়বারের মতো এ উৎসবের আয়োজন করা হয়। যৌথ আয়োজক ছিল একশনএইড বাংলাদেশ, বুয়েট, জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (জেটনেট-বিডি) এবং বুয়েটের ইনস্টিটিউট অব এনার্জি অ্যান্ড সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট (আইইএসডি)।
১২ দফা ঘোষণাপত্র প্রকাশ
উৎসবের শেষ দিনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে ১২ দফা ঘোষণাপত্র প্রকাশ করা হয়। এতে স্বতন্ত্র নবায়নযোগ্য জ্বালানি আইন প্রণয়ন, সৌরশক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণ, কৃষির সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সমন্বয়ে অ্যাগ্রিভোল্টেইকস প্রযুক্তির বিকাশ এবং ব্যাটারি সংরক্ষণব্যবস্থার মাধ্যমে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড আধুনিকায়নের সুপারিশ করা হয়।
এ ছাড়া রেয়াতি ঋণ, গ্রিন বন্ড ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে সবুজ জ্বালানি খাতে অর্থায়ন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন, পরিবেশবান্ধব কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিল্প খাতে কার্বন নিঃসরণ কমানোর বিষয়েও সুপারিশ করা হয়।
ঘোষণাপত্রে নারী, আদিবাসী জনগোষ্ঠী, শ্রমিক ও প্রান্তিক মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি জলবায়ু অর্থায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি, শ্রমিকদের সুরক্ষা এবং স্বাধীন পরিবেশগত ও সামাজিক পর্যবেক্ষণব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানানো হয়। দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতা ও প্রযুক্তি হস্তান্তর বাড়ানোর বিষয়টিও এতে গুরুত্ব পেয়েছে।
বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা
উৎসবের শেষ দিনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অর্থায়ন ও বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো, সামাজিক ও পরিবেশগত সুরক্ষা এবং জ্বালানি নীতি ও সুশাসন নিয়ে একাধিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
‘বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অর্থায়ন ও বিনিয়োগ’ শীর্ষক আলোচনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের নির্বাহী পরিচালক জাকির হোসেন খান। সঞ্চালনা করেন একশনএইড বাংলাদেশের হেড অব প্রোগ্রাম অ্যান্ড এনগেজমেন্ট কাজী মোর্শেদ আলম। আলোচনায় বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি তানজিনা দিলশাদ, গ্রিনার গার্মেন্টস ইনিশিয়েটিভের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নুরে আলম এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স বিভাগের পরিচালক একেএম নুরুননবীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন।
আলোচকেরা নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবকাঠামো উন্নয়নে কার্যকর নীতিমালা ও কর্মপরিকল্পনা, উপযুক্ত ট্যারিফ ব্যবস্থা, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব এবং গবেষণায় অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। সৌরচালিত সেচব্যবস্থার সম্প্রসারণ, দেশীয় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জ্ঞান ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
জ্বালানি রূপান্তরে তরুণদের ভূমিকা
তরুণদের নেতৃত্বে ‘ফ্রম কমিটমেন্ট টু কমিউনিটি: অ্যাডভান্সিং আ জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন থ্রু বাংলাদেশ এনডিসি ৩.০’ শীর্ষক সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। এতে বায়ুদূষণ ও ধুলাবালি কমানো, সৌরচালিত সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণ এবং ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) প্রযুক্তির মতো উদ্ভাবনী সমাধান ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
আগামী ১২ মাসে তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন, পরিবেশবান্ধব উদ্যোক্তা তৈরি এবং সবুজায়ন কার্যক্রমে তাঁদের সম্পৃক্ত করতে কার্যকর কর্মপরিকল্পনা তৈরির আহ্বান জানান আলোচকেরা।
উৎসবে দেশীয় উদ্ভাবক ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নবায়নযোগ্য জ্বালানিবিষয়ক প্রযুক্তি, পণ্য ও সেবা প্রদর্শন করা হয়। এ ছাড়া কাকতাড়ুয়া পাপেট থিয়েটারের পরিবেশনায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা ও উপকারিতা তুলে ধরা হয়।
উদ্ভাবক ও তরুণদের পুরস্কার
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে উৎসবে কয়েকটি প্রকল্প ও উদ্যোগকে পুরস্কৃত করা হয়। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম পুরস্কার পায় ফেলাইট প্রকল্প, দ্বিতীয় পুরস্কার কার্বন ক্রেডিট বিডি এবং তৃতীয় পুরস্কার আইইউবি ফর্মুলা-ই প্রকল্প। বিজয়ীদের সনদ ও সিডমানি দেওয়া হয়। পাশাপাশি আইইউবি, বুয়েট ও ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের তৈরি পোস্টার সেরা তিনটি পোস্টার হিসেবে নির্বাচিত হয়।
সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারপারসন জাহরাত আদিব চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন একশনএইড ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ সোসাইটির বোর্ড চেয়ারম্যান ইব্রাহিম খলিল আল জায়াদ।
এ ছাড়া বুয়েটের অধ্যাপক এমএএ শওকত চৌধুরী, একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবিরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অনুষ্ঠানে অংশ নেন। সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মধ্য দিয়ে তিন দিনের এ উৎসব শেষ হয়।
সূত্র: আয়োজকদের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি।




