ইসরায়েলের নির্বাচন: নেতানিয়াহুর ক্ষমতা কি হারানোর ঝুঁকিতে?
ঢাকা, , |
আজকের সর্বশেষ সবখবর

নেতানিয়াহুর ভাগ্য নির্ধারণে ইসরাইলে ভোট: রাজনৈতিক মোড় কি আসন্ন?

জনবার্তা প্রতিবেদন
অক্টোবর ২৭, ২০২৬ ৬:০২ অপরাহ্ণ
Link Copied!

ইসরাইলে আজ মঙ্গলবার অত্যন্ত গুরুত্ববহ এক জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই ভোটাভুটিতে দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আবারও ক্ষমতায় টিকে থাকার লড়াইয়ে নেমেছেন। তবে তার নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী জোটের বিরুদ্ধে বিরোধী শিবিরে ব্যাপক প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলোতে এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষই এককভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে নেই, ফলে সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না। সরকারে কট্টর ডানপন্থি নেতা ইতামার বেন-গভির ও অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচের প্রভাবও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। নেতানিয়াহু হারলে কী পরিবর্তন আসতে পারে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে হামলার ঘটনার পর এটিই ইসরাইলের প্রথম জাতীয় নির্বাচন। ওই হামলার পরবর্তী সময়ে গাজা উপত্যকায় সামরিক অভিযান এবং লেবানন, ইরান, ইয়েমেন, সিরিয়া ও কাতারে সংঘাতের ব্যাপক প্রসারের ফলে পুরো অঞ্চল উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। এসব পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে এবারের নির্বাচনী প্রচারণায়। নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সরকারের জবাবদিহিতা, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি ইসরাইলের রাষ্ট্রীয় নীতি এখন ভোটারদের কাছে প্রধান আলোচ্য বিষয়।

নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি এবং তার ক্ষমতাসীন জোটে কট্টর ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী দলসহ অতি-গোঁড়া ইহুদি ধর্মীয় দলগুলোর সমর্থন রয়েছে।

দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকলেও এবার তিনি বহুবিধ চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়েছেন। গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানার মুখে রয়েছেন তিনি। এছাড়া ঘুষ, জালিয়াতি ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে চলা দুর্নীতির মামলাও রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে। অবশ্য নেতানিয়াহু এসব অভিযোগ শুরু থেকেই অস্বীকার করে আসছেন।

নির্বাচনী আলোচনায় উঠে এসেছে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের আগে ও পরের নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতা। এছাড়া কট্টর ইহুদিদের সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগ এবং আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর অংশগ্রহণ নিয়েও ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সমালোচকরা মনে করেন, নেতানিয়াহুর সরকারের অধীনে ইসরাইলের সমাজ ও রাজনীতি ক্রমশ ডানপন্থী হয়ে পড়ছে। এর অন্যতম উদাহরণ হিসেবে ২০১৮ সালে পাস হওয়া ‘জাতিরাষ্ট্র আইন’-এর দিকে ইঙ্গিত করেন তারা, যেখানে ইসরাইলকে ইহুদিদের জাতিরাষ্ট্র হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। সরকারের বিচার বিভাগ সংস্কার পরিকল্পনা সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা সীমিত করার চেষ্টা হিসেবে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করে।

বিশ্লেষক আহরন ব্রেগম্যানের মতে, নেতানিয়াহু ইসরাইলি রাজনীতিতে অত্যন্ত বিভাজন সৃষ্টিকারী একজন নেতা। তার বিদায় ঘটলে রাজনৈতিক উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও, সামগ্রিক নীতিতে রাতারাতি পরিবর্তনের সুযোগ কম। তিনি মনে করেন, ৭ অক্টোবরের পরবর্তী ইসরাইলি সমাজ আরও বেশি ডানমুখী হয়েছে। ফলে সরকার বদল হলেও সেই রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন থেকেই যাবে।

চ্যাথাম হাউসের গবেষক ইয়োসি মেকেলবার্গের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই নির্বাচনের ফলাফলের সঙ্গে ইসরাইলের গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভবিষ্যৎ সরাসরি জড়িত। তবে মূলধারার বিরোধীদলীয় প্রার্থীরাও ফিলিস্তিনিদের প্রতি রাষ্ট্রীয় নীতির মৌলিক পরিবর্তনের চেয়ে বরং নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা এবং নেতৃত্বের ব্যর্থতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। নির্বাচনের আগে বিভিন্ন জনমত জরিপে দুই পক্ষের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস মিলেছে।

বিশেষজ্ঞ ইয়েহুদা শেনহাভ-শাহরাবানির মতে, ইসরাইলি রাজনৈতিক ব্যবস্থা এমন একটি কাঠামোর মধ্যে আবর্তিত হচ্ছে যেখানে ইহুদি আধিপত্যকে প্রধান অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। তিনি উল্লেখ করেন যে, বিরোধী পক্ষের নেতারাও প্রকৃত বামপন্থী রাজনীতির পরিবর্তে ইহুদি ও ফিলিস্তিনিদের সমানাধিকারের বিষয়ে নীরব। ইসরাইলের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ফিলিস্তিনি নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও, মূলধারার কোনো দলই সরকারে আরব দলগুলোর অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেয়নি। ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে শান্তি প্রক্রিয়ার ভাঙন এবং কয়েক দশকের নিরাপত্তা সংকট দেশটির মধ্যপন্থী ও বামপন্থী রাজনৈতিক শক্তিকে ক্রমেই দুর্বল করেছে। একই সঙ্গে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলি বসতি সম্প্রসারণ এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিয়ে বিতর্ক আরো গভীর হয়েছে। একই সঙ্গে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বৃদ্ধি নিয়েও তাদের ভূমিকা সমালোচিত হয়েছে।

ড্যানিয়েল লেভির মতো বিশ্লেষকদের মতে, গাজায় যুদ্ধ এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকারের বিষয়ে জায়নবাদী দলগুলোর মধ্যে মৌলিক ঐকমত্য বিরাজমান।

তাদের মধ্যে মতপার্থক্য মূলত নিপীড়নের পদ্ধতি এবং দায়িত্ব কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে।

ফলে এই নির্বাচন নেতানিয়াহুর বিদায় বা টিকে থাকার লড়াই হলেও, দেশটির পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তানীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।

নির্বাচন পরবর্তী সময়ে গাজা যুদ্ধ, দখলদারত্ব এবং রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্নে ইসরাইল কোন পথে এগোবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।