ইউরোপের নতুন নীতি ও বাংলাদেশের জাহাজভাঙা শিল্পের ভবিষ্যৎ
ঢাকা, , |
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ইউরোপের নতুন নীতি: বাংলাদেশের জাহাজভাঙা শিল্পের সামনে চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

জনবার্তা প্রতিবেদন
অক্টোবর ২৯, ২০২৬ ৫:৫৪ অপরাহ্ণ
Link Copied!

ড. ইশতিয়াক আহমেদ
অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, আইন বিভাগ, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি

বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকারী দেশ। দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও ইস্পাতশিল্পে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা এ খাতের ভবিষ্যৎ এখন পরিবেশ সুরক্ষা, শ্রমিকদের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে চলার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সাম্প্রতিক নীতিগত উদ্যোগ বাংলাদেশের জাহাজভাঙা শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।

ভারতের ইয়ার্ড নিয়ে ইউরোপের উদ্যোগ, বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ

২০২৬ সালের ২৩ জুলাই ইউরোপীয় জাহাজমালিকদের কয়েকটি সংগঠন ভারতের আলাংয়ে বিচিং পদ্ধতিতে পরিচালিত দুটি জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ স্থাপনাকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অনুমোদিত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক শিপিং সংগঠন বিমকোও এ উদ্যোগের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। তাদের যুক্তি, যেসব ইয়ার্ড নিরাপদ ও পরিবেশসম্মত জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ-সংক্রান্ত হংকং কনভেনশনের শর্ত পূরণ করে, সেগুলোকে শুধু বিচিং পদ্ধতি ব্যবহারের কারণে অনুমোদনের বাইরে রাখা উচিত নয়।

বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান—এই তিন দেশেই বিচিং পদ্ধতিতে বড় পরিসরে জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করা হয়। তাই ভারতের ইয়ার্ডগুলোকে অনুমোদন দেওয়ার বিষয়ে ইউরোপীয় কমিশনের অবস্থান বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের শিপ রিসাইক্লিং রেগুলেশন অনুযায়ী, এর আওতাভুক্ত ইউরোপীয় জাহাজগুলোকে অনুমোদিত স্থাপনাতেই পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করতে হয়। ভারতের কিছু ইয়ার্ড অনুমোদন পেলে, অথচ বাংলাদেশের যোগ্য ইয়ার্ডগুলো তালিকার বাইরে থাকলে, ইউরোপীয় জাহাজ সংগ্রহ ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হতে পারে।

তবে অন্য দেশের কোনো স্থাপনা অনুমোদন পেলেই বাংলাদেশের ইয়ার্ডগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে একই সুবিধা পাবে না। প্রতিটি স্থাপনাকে নির্ধারিত শর্ত পূরণ করতে হবে এবং প্রমাণভিত্তিক মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। বাংলাদেশের জন্য তাই গুরুত্বপূর্ণ হলো—নিজেদের যোগ্যতা ও সম্মতি-সংক্রান্ত প্রমাণ তুলে ধরে স্বচ্ছ, ধারাবাহিক ও সামঞ্জস্যপূর্ণ মূল্যায়নের সুযোগ নিশ্চিত করা।

নিরাপত্তা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি দূর করার প্রয়োজন

দক্ষিণ এশিয়ার জাহাজভাঙা শিল্পে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ঘটলেও শ্রমিকদের নিরাপত্তা এবং বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। পুরোনো জাহাজ থেকে অ্যাসবেস্টস, ভারী ধাতু, বিষাক্ত রং ও দূষিত তেলসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর উপাদান পাওয়া যেতে পারে। এসব উপাদান কীভাবে অপসারণ, সংরক্ষণ ও নিষ্পত্তি করা হচ্ছে, তার স্বচ্ছ নথি থাকা জরুরি।

এ ক্ষেত্রে বাসেল কনভেনশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর ৪ নম্বর অনুচ্ছেদে বিপজ্জনক বর্জ্যের আন্তসীমান্ত চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশসম্মত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার বিষয়ে পক্ষরাষ্ট্রগুলোর বাধ্যবাধকতা নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে ইউরোপীয় জাহাজ দক্ষিণ এশিয়ায় গেলেই প্রতিটি ক্ষেত্রে বাসেল কনভেনশন লঙ্ঘিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো আইনগতভাবে যথাযথ নয়। একইভাবে কোনো ইয়ার্ড ইউরোপীয় ইউনিয়নের অনুমোদিত তালিকায় স্থান পেলেই বাসেল কনভেনশনের সব বাধ্যবাধকতা পূরণ হয়েছে, এমনটিও ধরে নেওয়া যায় না। প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন, জাহাজের অবস্থা, বর্জ্যের ধরন এবং সংশ্লিষ্ট পরিবহন ও নিষ্পত্তি-প্রক্রিয়া বিবেচনা করতে হবে।

হংকং কনভেনশন মানলেই কি ইইউর অনুমোদন নিশ্চিত?

নিরাপদ ও পরিবেশসম্মত জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য হংকং কনভেনশনের শর্ত পূরণ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়নের অনুমোদিত তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য শুধু এই কনভেনশনের শর্ত পূরণ করাই যথেষ্ট নয়। ইইউর নিজস্ব বিধিমালায় নির্ধারিত পরিবেশগত সুরক্ষা, শ্রমিকদের নিরাপত্তা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং স্থাপনা পরিদর্শন-সংক্রান্ত শর্তও পূরণ করতে হয়।

অতএব, বাংলাদেশের ইয়ার্ডগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক সনদ বা নীতিগত স্বীকৃতির পাশাপাশি বাস্তব ব্যবস্থাপনার মান উন্নত করা জরুরি। নিরাপত্তা পরিকল্পনা, বর্জ্যের গতিপথের নথি, নিয়মিত পরিদর্শন এবং বিধিমালা কার্যকরের সক্ষমতা—সব ক্ষেত্রেই উন্নতি প্রয়োজন।

বিচিং পদ্ধতি, উপকূলীয় পরিবেশ ও শ্রমিক সুরক্ষা

বিচিং পদ্ধতিতে জোয়ার-ভাটাপ্রবণ উপকূলে জাহাজ ভাঙার সময় তেল ও রাসায়নিক পদার্থ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। তবে সব স্থাপনায় ঝুঁকির মাত্রা এক নয়; তা নির্ভর করে অবকাঠামো, কাজের পদ্ধতি, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং তদারকির কার্যকারিতার ওপর।

এ কারণে নিয়মিত পরিবেশগত পর্যবেক্ষণ, কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম, পেশাগত রোগ শনাক্তকরণ, চিকিৎসা এবং প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

শ্রমিক সুরক্ষা ও পরিবেশগত মান উন্নয়নকে শুধু আন্তর্জাতিক অনুমোদন পাওয়ার শর্ত হিসেবে দেখলে চলবে না। দীর্ঘমেয়াদে শিল্পটির গ্রহণযোগ্যতা, উৎপাদনশীলতা এবং টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্যও এগুলো অপরিহার্য।

বাংলাদেশের করণীয়

ভারতের ইয়ার্ডগুলোকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব বাংলাদেশের জন্য একই সঙ্গে সম্ভাবনা ও সতর্কবার্তা। একদিকে, আন্তর্জাতিক মান পূরণকারী স্থাপনাগুলোর জন্য প্রতিযোগিতার সুযোগ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের ইয়ার্ডগুলো প্রয়োজনীয় মানদণ্ড পূরণে পিছিয়ে থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের অবস্থান চাপে পড়তে পারে।

এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, ইউরোপীয় কমিশনের অনুমোদন-মানদণ্ড ও সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, যোগ্য বাংলাদেশি ইয়ার্ডগুলোর আবেদন ও মূল্যায়ন-প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং সামঞ্জস্য নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নিতে হবে। তৃতীয়ত, বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশগত নজরদারি এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তায় বাস্তব উন্নয়ন ঘটাতে হবে।

বাংলাদেশের জাহাজভাঙা শিল্পের ভবিষ্যৎ শুধু আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার ওপর নির্ভর করছে না; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবেশ সুরক্ষা, শ্রমিকের অধিকার এবং দেশের শিল্পনীতির বিশ্বাসযোগ্যতা। আন্তর্জাতিক মান পূরণ ও কার্যকর তদারকির মাধ্যমে বাংলাদেশ এ খাতকে আরও নিরাপদ, প্রতিযোগিতামূলক ও টেকসই শিল্পে রূপান্তর করতে পারে।