বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস নতুন মাত্রা পেয়েছে। আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের কথিত আঁতাত, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন এবং সংবিধান সংস্কারের পদ্ধতি নিয়ে দুই দলের নেতাদের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
বিএনপির অভিযোগ, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের গোপন সমঝোতা থাকতে পারে। অন্যদিকে জামায়াত এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলছে, রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য বিএনপি এমন বক্তব্য দিচ্ছে। তবে দুই দলের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের বাইরে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের মধ্যে কোনো সমঝোতার স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
বিএনপির সন্দেহের কারণ কী?
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী দাবি করেছেন, আওয়ামী লীগ দেশের বিভিন্ন কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টি এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে। তাঁর ভাষ্য, সীমান্তের ওপার থেকে অর্থ সরবরাহ করে দেশের ভেতরে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা চলছে।
রিজভীর অভিযোগ, জামায়াত আওয়ামী লীগকে ক্ষমা করে দেওয়ার কথা বলেছিল। ৫ আগস্টের পর কয়েক মাসের মধ্যেই দলটির নেতাদের এমন বক্তব্য জনমনে সন্দেহ তৈরি করেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিএনপির এই নেতা আরও বলেন, জামায়াত গোপনে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে মিলে সরকারকে চাপে ফেলে দ্রুত ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটানোর চেষ্টা করতে পারে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে প্রকাশ্যে আসা তথ্যের বিস্তারিত বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ স্পষ্ট নয়।
জামায়াতের পাল্টা বক্তব্য
বিএনপির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেছেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের আঁতাতের অভিযোগ অবাস্তব। তাঁর বক্তব্য, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি হয়েছে এবং দলটির কার্যালয় দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। এমন পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার প্রশ্নই আসে না।
আযাদ পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে জামায়াতকে রাজপথে আন্দোলন করার সুযোগ দেওয়া হয়নি। অথচ বিএনপি দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন, সভা ও মিছিলের সুযোগ পেয়েছে। তাঁর দাবি, বিএনপি নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান থেকে জনসাধারণের দৃষ্টি সরাতে জামায়াতের বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দিচ্ছে।
জামায়াতের এই নেতা আরও অভিযোগ করেন, বিএনপি সরকার জুলাই সনদ ও গণভোটের দাবি বাস্তবায়ন এড়িয়ে যাচ্ছে। তবে এসব বক্তব্যও দলীয় নেতার রাজনৈতিক অভিযোগ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
জুলাই সনদ ও সংবিধান সংস্কার নিয়ে বিরোধ
দুই দলের মতবিরোধের আরেকটি বড় ক্ষেত্র জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি। বিএনপি বলছে, সনদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা হবে; তবে সংবিধান পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সংসদীয় প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দিতে হবে।
অন্যদিকে জামায়াতসহ ১১ দলীয় জোটের অবস্থান, গণভোটের রায় অনুযায়ী জুলাই সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে হবে। এ জন্য তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি জানিয়ে আসছে।
সংসদের বিশেষ কমিটির মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগে জামায়াতসহ বিরোধী দলগুলোর আপত্তি রয়েছে। তাদের মতে, গণভোটের রায় পাশ কাটিয়ে সাধারণ সংসদীয় প্রক্রিয়ায় সংস্কার কার্যক্রম চালানো হলে তা জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে। বিএনপি অবশ্য বলছে, সংসদীয় প্রক্রিয়ায় সংস্কার করলেও তা একতরফা হবে না।
জুলাই জাতীয় সনদের ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে ৪৮টি সংবিধান-সম্পর্কিত। এসব প্রস্তাব কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য এখনো রয়ে গেছে। বিরোধী দলগুলোর অনুপস্থিতিতে সংসদের বিশেষ কমিটির কার্যক্রম নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
পুরোনো রাজনৈতিক সম্পর্ক, নতুন অবিশ্বাস
বিএনপি ও জামায়াত অতীতে বিভিন্ন সময়ে জোটবদ্ধ রাজনীতি করেছে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠনে জামায়াতের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ২০০১ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারেও জামায়াত অংশীদার ছিল। পরবর্তী সময়ে ২০-দলীয় জোটের ব্যানারেও দুই দলকে একসঙ্গে আন্দোলন করতে দেখা গেছে।
তবে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই সম্পর্কের জায়গায় দূরত্ব ও অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে। আওয়ামী লীগের সঙ্গে কথিত আঁতাতের অভিযোগ সেই দূরত্বকে আরও আলোচনায় এনেছে।
অভিযোগের প্রমাণ কতটুকু?
রাজনৈতিক বক্তব্যে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের সম্ভাব্য যোগাযোগের কথা বলা হলেও প্রকাশ্যে আসা তথ্য থেকে এমন কোনো সমঝোতা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। বিএনপি গোয়েন্দা তথ্য ও নথিপত্র থাকার দাবি করেছে; জামায়াত সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
অন্যদিকে জুলাই সনদ ও সংবিধান সংস্কার নিয়ে দুই দলের প্রকাশ্য অবস্থানের পার্থক্য নথিভুক্ত। ফলে আওয়ামী লীগকে ঘিরে অভিযোগের পাশাপাশি সংস্কার প্রক্রিয়া নিয়ে মতবিরোধও বিএনপি-জামায়াতের বর্তমান রাজনৈতিক টানাপোড়েন বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে—আওয়ামী লীগের সঙ্গে কথিত আঁতাতের অভিযোগ কি গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তোলা, নাকি জুলাই সনদ ও সংবিধান সংস্কার নিয়ে রাজনৈতিক মতবিরোধেরই প্রতিফলন? প্রকাশ্য তথ্যের ভিত্তিতে এখনই নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।



